আল্লাহ আমাদের বাঁচাতে জেলেদের পাঠিয়েছিল

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে শুক্রবার (১০ মে) ভূমধ্যসাগরে নৌকা ডুবে প্রায় ৬০ জন মারা গেছে বলে জানিয়েছে তিউনিসিয়া রেড ক্রিসেন্ট। নিহতদের বেশিরভাগই বাংলাদেশি।

ডুবে যাওয়াদের মধ্যে ১৬ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয় যাদের মধ্যে সিলেটের আহমেদ বিলাল একজন। আহমেদ বিলাল বেঁচে যাওয়ার পর বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘আল্লাহ আমাদের বাঁচাতে জেলেদের পাঠিয়েছিলেন’।

৩০ বছর বয়সী বাংলাদেশি তরুণ আহমেদ বিলাল তিউনিসিয়ার উপকূলীয় শহর জারজিসে রেড ক্রিসেন্টের একটি আশ্রয় কেন্দ্রে রয়েছেন। তিনি নিজে বেঁচে গেলেও তার দুজন আত্মীয় এই ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন বলে তিনি এএফপিকে জানান।

নিজের স্বপ্নের ইউরোপ যাত্রা সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি জানান, উন্নত জীবনের আশায় তিনি ইউরোপ যেরেত চেয়েছিলেন। দালালের মাধ্যমে তিনি ইতালিতে পাড়ি দিতে চেয়েছিলেন। এজন্য তিনি পারিবারিক জমি বিক্রি করে দালালকে সাত হাজার মার্কিন ডলার দিয়েছেন। আহমেদ বিলাল দালালের পরিচয় জানাতে পারেন নি, কেননা তিনি নিজেও দালালকে ‘গুডলাক’ ছদ্মনামে চিনেন।

তিনি বলেন, ‘এই দালাল আমাকে বলেছিল, আমরা বেশ ভালো জীবনযাপন করতে পারবো। আমরা তাকে বিশ্বাস করেছিলাম। আমি নিশ্চিত যত লোককে সে এভাবে পাঠায়, তাদের বেশিরভাগই মারা যায়।’

আহমেদ বিলাল তারা দীর্ঘ ইউরোপ যাত্রার গতিপথ সম্পর্কে জানান, ছয় মাস আগে তিনি প্রথমে দুবাই আসেন। তার সাথে এসময় আরও দুজন ছিলেন। এরপর তাদেরকে নিয়ে যাওয়া হয় তুরস্কের ইস্তান্বুলে। এরপর সেখার থেকে নিয়ে যাওয়া হয় লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলিতে।

ত্রিপোলিতে গিয়েই শুরু হয় অমানবিক জীবন-যাপন। তিনি জানান, ত্রিপোলিতে তাদের সঙ্গে আরও ৮০ জন বাংলাদেশি যোগ দেন। তাদেরকে পশ্চিম লিবিয়ার একটি রুমে তিন মাস আটকে রাখা হয়। বিশাল এ জনসংখ্যার জন্য ছিল মাত্র একটি টয়লেট।

আহমেদ বিলাল বলেন, ‘আমার মনে হয়েছিল, আমি লিবিয়াতেই মারা যাব। আমাদের দিনে মাত্র একবার খাবার দেয়া হতো। অনেকসময় তারও কম। আশি জন মানুষের জন্য সেখানে টয়লেট ছিল একটি। আমরা শৌচকর্ম পর্যন্ত করতে পারতাম না। আমরা খাবারের জন্য কান্নাকাটি করতাম।’

লিবিয়ায় দুর্বিষহ জীবন কাটিয়ে শুরু হয় বিলালদের স্বপ্নের ইউরোপ যাত্রা। তবে এ পথ আরও বিপদজনক। তাদেরকে উত্তর-পশ্চিম লিবিয়া থেকে একটি বড় নৌকায় তোলা হয়। সাগরের মাঝামাঝিতে গিয়ে তাদের ছোট নৌকায় তোলা হয়।

আহমেদ বিলালের সঙ্গে ঐ নৌকায় থাকা মিশরীয় নাগরিক মনজুর মোহাম্মদ মেতওয়েলা বলেন, ‘এই ছোট নৌকাটি সাথে সাথে ডুবে যেতে শুরু করে। আমরা সারারাত ধরে সাঁতার কেটে ভেসে থাকি।’

বেঁচে যাওয়া যাত্রীরা জানিয়েছেন, সব যাত্রীরাই পুরুষ ছিলেন যার মধ্যে ৫১ জন ছিলেন বাংলাদেশের। তিন জন মিশরের। এছাড়া মরক্কো, শাদ এবং আরও কয়েকটি আফ্রিকান দেশেরও কয়েকজন ছিলেন।

বিলাল বলেন, ‘বেঁচে থাকার সব আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। তারপর আল্লাহ যেন আমাদের বাঁচাতে এই জেলে নৌকা পাঠালেন।’

জেলেরা মোট ১৬ জনকে উদ্ধার করেন যাদের ১৪ জন বাংলাদেশি। বাকি দুজনের একজন মরোক্কোর, একজন মিশরের।

রেড ক্রিসেন্টের কর্মকর্তা মনজি স্লিম বলেন, ‘যদি তিউনিসিয়ার জেলেরা এদের দেখতে না পেত, এদের কেউই আসলে বাঁচতো না এবং এই ঘটনার কথাও হয়তো আমরা জানতে পারতাম না।’

বেঁচে যাওয়া আহমেদ বিলালসহ বাকিদের সামনে এখন তিনটি পথ খোলা আছে। তাদের হয় নিজ দেশে ফিরে যেতে হবে, অথবা জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার মাধ্যমে আশ্রয় চাইতে পারে, অথবা তিউনিসিয়াতেই তাদের ভাগ্য পরীক্ষা করতে পারে।

বেঁচে যাওয়া আহমেদ বিলাল বলেন, ‘আমরা তো সবকিছু হারিয়েছি। আমার এখন কিছুই নেই’। তিনি কিছু উপার্জন করে দেশে ফেরার জন্য এখনো ইউরোপেই যেতে চান বলে জানিয়েছেন।

এদিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, ‘আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য জানিয়ে খবর প্রকাশ করা হচ্ছে। তবে আমরা এখনও নিশ্চিত নই নিহতদের মধ্যে কতজন বাংলাদেশি রয়েছেন।’ সূত্র: ব্রেকিংনিউজ/

প্রিন্ট করুন

বিভাগ: আন্তর্জাতিক