এবার কুয়েত, বাহরাইন ও আফগানিস্তানে করোনার হানা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাস এবার কুয়েত, বাহরাইন ও আফগানিস্তানে হানা দিয়েছে। দেশ ৩টিতে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

বাহরাইনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরান থেকে আসা তাদের এক নাগরিকের করোনা শনাক্ত হয়েছে। করোনায় আক্রান্ত ওই ব্যক্তিকে বর্তমানে হাসপাতালে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

এদিকে কুয়েত জানিয়েছে, তাদের দেশে তিন জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছে। কুয়েত নিউজ এজেন্সির খবরে বলা হয়েছে, আক্রান্ত তিনজনই সম্প্রতি ইরান ভ্রমণ করে।

এছাড়া যুদ্ধবিদ্ধস্ত আফগানিস্তানেও একজনের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার খবর নিশ্চিত করা হয়েছে।

এদিকে করোনা ভাইরাসে চীনে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২ হাজার ৫৯২ জনে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া চীনের বাইরে নিহত হয়েছে ২৭ জন। এর মধ্যে ইরানে ৮, দক্ষিণ কোরিয়ায় ৭, জাপান ৪, হংকং ২, ইটালিতে ৩, ফিলিপাইন, তাইওয়ান ও ফ্রান্স ১ জন করে মোট ২ হাজার ৬১৯ জন নিহত হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় নিহত হয়েছে ১৫৭ জন।

এ ভাইরাসে চীনে আক্রান্তের সংখ্যা ৭৭ হাজার ৩৪৫ জন এবং চীনের বাইরে ২ হাজার ২১৬ জন। সবমিলিয়ে পুরো বিশ্বে আক্রান্তের সংখ্যা ৭৯ হাজার ৫৬১ জনে দাঁড়িয়েছে। এখন পর্যন্ত মোট ২৫ হাজার ২৩ জন সুস্থ হয়েছে।

সোমবার সকালে চীনের জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশন জানায়, চীনে নতুন করে গত ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত হয়েছে ৪০৯ জন এবং মারা গেছে ১৫০ জন। এ পর্যন্ত মোট আক্রান্ত ৭৭ হাজার ৩৪৫ জন এবং মারা গেছে ২ হাজার ৫৯২ জন। আক্রান্তদের মধ্যে ১১ হাজার ৫০০ এর বেশি মানুষের অবস্থা আশঙ্কানক। এছাড়া চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে রয়েছে কয়েক লাখ মানুষ।

হুবেই প্রদেশের রাজধানী উহান, সেখানাকার একটি সামুদ্রিক খাদ্য ও মাংসের বাজার থেকে এই করোনা ভাইরাসটির উৎপত্তি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।ভাইরাসটি যাতে ছড়িয়ে না যায়, সেজন্য চীন হুবেই প্রদেশকে পুরো দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে।ওই অঞ্চলের সাথে সকল ধরনের যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে চীনসহ বাইরের বিশ্ব থেকে।

সোমবার দেশটির জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশন এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, শুক্রবার পর্যন্ত ২৫ হাজার ২৩ জন সুস্থ হয়েছে এবং তারা হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার ছাড়পত্র পেয়েছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিদিন যে পরিমাণ আক্রান্তের খবর আসছে, তাতে আক্রান্তের আসল খবর জানা যাচ্ছে না।কারণ, ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে যারা হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে, শুধু তাদের হিসেব পরিসংখ্যানে ধরা হচ্ছে।তাই এর প্রকৃত হিসেব বের করা বা জানা খুবই কঠিন ব্যাপার, যা আরেকটি আশঙ্কার কারণ।

চীনের সবগুলো প্রদেশসহ বিশ্বের ৩২টি দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। চীনের বাইরে এ পর্যন্ত ২ হাজার ২১৬ জন শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে জাপানে ৮৩৮ এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় ৭৬৩ জন।

ভাইরাস সংক্রমণের কারণে চীন ভ্রমণে সতর্কতা, নিষেধাজ্ঞা জারি এবং কড়াকড়ি আরোপ করেছে অনেক দেশ।ভারত, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কাসহ অনেক দেশ চীন থেকে আগত যাত্রীদের ভিসা বাতিল করেছে।ভাইরাসের কারণে, বিশ্বের অনেক দেশ তাদের নাগরিকদের চীন ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।চীনে অধিকাংশ বিমান সংস্থার ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, কানাডা, ফ্রান্সসহ আরও অনেক দেশ তাদের নাগরিকদের চীন থেকে সরিয়ে নিচ্ছে।

করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে (কোভিড-১৯) চীনে ৬ স্বাস্থ্যকর্মীর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া চীনে ৩ হাজার স্বাস্থ্যকর্মী এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। রবিবার দেশটির জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশন এ তথ্য জানিয়েছেন।

চীনের জাতীয় স্বাস্থ্য কমিশনের সহকারী পরিচালক জেং ইজিন জানান, ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়ে এরইমধ্যে ৬ জন স্বাস্থ্যকর্মী নিহত হয়েছেন। এছাড়া ৩ হাজার জন স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হয়েছেন। যা ভাইরাসটিতে মোট আক্রান্ত রোগীদের ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। এর মধ্যে হুবেই প্রদেশে রয়েছে ২ হাজার ৫০২।

দক্ষিণ কোরিয়ায় করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে আরও ২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ৭ জনে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া নতুন করে ১৬১ জন-সহ মোট আক্রান্তের সংখ্যা ৭৬৩ জন। সোমবার দেশটির স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা এ তথ্য জানিয়েছেন। খবর সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, এএফপি, আলজাজিরা।

চীনের বাইরে এখন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। দেশটিতে এ পর্যন্ত সংক্রমিতের সংখ্যা সপ্তাহের ব্যবধানে তিন গুণ বেড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে চীনের প্রতিবেশী দেশটি এখন সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে। এ অবস্থায় পরিস্থিতি মোকাবিলায় রবিবার দেশে সর্বোচ্চ জরুরি অবস্থা ঘোষণা ও সতর্কতা জারি করেছে সরকার।

দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর দেইগুর একটি গির্জা থেকে ভাইরাসটি এখন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এখন পর্যন্ত ভাইরাসটিতে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৬৩। এর মধ্যে সোমবার নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ১৬১ জন। আক্রান্তের ৩০০ জনের বেশি গির্জা থেকে আক্রান্ত হয়েছে। এছাড়া ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়ে আরও দুজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গতকাল পর্যন্ত দেশটিতে মরণঘাতী এ ভাইরাসে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭। এছাড়া ১ হাজার ২৪০ জনের শরীরে ভাইরাসটির লক্ষণ দেখা গেছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে উচ্চমাত্রায় সতর্কতা জারির পাশাপাশি দেইগুসহ অন্যান্য শহরকে কার্যত বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারে সিউল। কোরিয়ান সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের তথ্যানুযায়ী, যে গির্জা থেকে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়েছে বলে বলা হচ্ছে, সেখানকার ৯ হাজার ৩০০ সদস্যকে কোয়ারান্টাইনে থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের পর দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জা-ইন জানান, আগামী কয়েক দিন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পরিস্থিতি বিবেচেনা করে এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হতে পারে। তবে ঠিক কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে সরকার, সেটি নির্দিষ্ট করেননি তিনি।

দক্ষিণ কোরিয়ার পর চীনের বাইরে কভিড-১৯ নিয়ে এখন ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় আতঙ্ক বাড়ছে। ইতালিতে এরই মধ্যে ৩ জন ভাইরাসটিতে সংক্রমিত হয়ে মারা গেছে। আক্রান্তের সংখ্যা এখন পর্যন্ত ১৫৭ জন। দেশটি এখন চীনের হুবেই প্রদেশের মতো ১০টি শহর কোয়ারান্টাইনে রাখার ব্যবস্থা করছে। এরই মধ্যে ইতালির অন্যতম বাণিজ্যিক কেন্দ্র মিলানের পার্শ্ববর্তী এক ডজনের মতো শহরের ৫০ হাজারের বেশি বাসিন্দাকে বাইরে চলাচলে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এছাড়া এসব শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও দোকান বন্ধ রাখা হয়েছে। সংক্রমণ ঠেকাতে সরকার আরো কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন ইতালির প্রধানমন্ত্রী জোসেফ কন্তে।

অন্যদিকে ইরানে ভাইরাসটির প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়ার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে গতকাল ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র কিনাউশ জাহানপোর জানান, এ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে আট। এছাড়া আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে ৪৩-এ ঠেকেছে।

ইরানের পবিত্র নগরী কোমে প্রথম ভাইরাসটির প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। গতকাল আক্রান্ত হওয়া ১৫ জনের সাতজনই কোমের বাসিন্দা। বাকিরা রাজধানী তেহরানসহ অন্যান্য এলাকার। পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশটির ১৪টি প্রদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। আর প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগে কড়া সতর্কতা অবলম্বন করছে কুয়েত, ইরাকসহ অন্যান্য দেশ।

এছাড়া ইউরোপের ইতালিতে ১৫৭ জন আক্রান্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত নিহত হয়েছে ৪ জন।

আর অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যসেবায় ভঙ্গুর অবস্থায় থাকা আফ্রিকাকে নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। মিসরে প্রথমবারের মতো একজনের সংক্রমিত হওয়ার খবর জানার পর জাতিসংঘের সংস্থাটি বলছে, আফ্রিকা মহাদেশটি এমনিতেই খুব ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। এ অবস্থায় নভেল করোনাভাইরাস মোকাবেলায় আফ্রিকা ইউনিয়নকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে তারা।

ডব্লিউএইচওর প্রধান টেড্রোস অ্যাডহ্যানম মনে করেন, আফ্রিকার অনেক দেশে শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সরঞ্জামের পর্যাপ্ত অভাব রয়েছে, যা ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়লে উদ্বেগের অন্যতম কারণ হবে।

গত ডিসেম্বরে চীনে উদ্ভূত করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিনই বাড়ছে মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা।এখন পর্যন্ত চীনের বাইরে বিশ্বের ৩২টি দেশে ২ হাজার ২১৬ জন করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। শুধু চীনেই আক্রান্তের সংখ্যা ৭৭ হাজার ৩৪৫ জন।

যেসব দেশে করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে-

চীন- ৭৭ হাজার ৩৪৫ জন, জাপান- ৮৩৮ জন, দক্ষিণ কোরিয়া- ৭৬৩ জন, ইটালি- ১৫৭ জন, সিঙ্গাপুর- ৮৯ জন, হংকং- ৭৪ জন, ইরান- ৪৩, থাইল্যান্ড- ৩৫ জন, যুক্তরাষ্ট্র- ৩৫ জন, তাইওয়ান- ২৮ জন, অস্ট্রেলিয়া- ২৩ জন, মালয়েশিয়া- ২২ জন, জার্মানি- ১৬ জন, ভিয়েতনাম- ১৬ জন, ফ্রান্স- ১২ জন, আরব আমিরাত- ১৩ জন, ম্যাকাও- ১০ জন, কানাডা- ১০ জন, যুক্তরাজ্য- ১৩ জন, ফিলিপাইন- ৩ জন, ভারত- ৩ জন, রাশিয়া- ২ জন, স্পেন- ২ জন, বেলজিয়াম- ১ জন, কম্বোডিয়া- ১ জন, মিশর- ১ জন, ফিনল্যান্ড- ১ জন, ইজরাইল- ২ জন, লেবানন- ১ জন, নেপাল- ১ জন, শ্রীলঙ্কা- ১ জন, সুইডেন- ১ জন ও ইরাক- ১ জন।

প্রিন্ট করুন

বিভাগ: আন্তর্জাতিক