এরশাদের সম্পদ বেড়েছে ‘হাজার শতাংশ’

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট: গণবিক্ষোভের মুখে ১৯৯০ সালে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এখন পর্যন্ত রাজনীতিতে সরব সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ (এইচ এম) এরশাদ। ক্ষমতাচ্যুতির পর থেকে এই রাজনীতিকের বিরুদ্ধে ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিচারাধীন ছিল ১০টি মামলা। আর দশম সংসদের আগে ছিল পাঁচটি। একাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদের বিরুদ্ধে বিচারাধীন রয়েছে একটি মামলা।

এ রকম বাস্তবতায় গত ২০ নভেম্বর একাদশ জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের সাক্ষাৎকারের সময় দুঃখ করে প্রধানমন্ত্রীর এই বিশেষ দূত এরশাদ বলেন, ‘এখনো আমার নামে মামলা আছে। একটা দিনের জন্যও মুক্ত ছিলাম না, এখনো নেই। আমার মতো দুঃখী রাজনীতিবিদ আর কেউ নেই।’

এরশাদ বছরের পর বছর মামলা বয়ে চললেও, তার সম্পদ বৃদ্ধি থেমে নেই। নবম জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে দশম জাতীয় নির্বাচনের তুলনা করলে পাঁচ বছরের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে প্রায় ৮৭৬ শতাংশ (৮৭৬.৭৯)। নবম জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে একাদশ জাতীয় নির্বাচনের তুলনা করলে ১০ বছরের ব্যবধানে এরশাদের সম্পদ বেড়েছে ১ হাজার ৪৯ দশমিক ৭৯ শতাংশ।

নবম, দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জমা দেয়া হলফনামা থেকে তাঁর সম্পদ ও মামলা সংক্রান্ত এসব তথ্য পাওয়া যায়। সর্বশেষ ২৬ নভেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে হলফনামা জমা দেন তিনি।

হলফনামা অনুযায়ী, এরশাদের ২০০৮ সালে স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ছিল ৫ কোটি ২৮ লাখ ৪০ হাজার ৪০০ টাকা। ২০১৪ সালে এটি দাঁড়ায় ৫১ কোটি ৬১ লাখ ৪০ হাজার ৫৪ টাকায়। আর ২০১৮ সালে হয় ৬০ কোটি ৭৫ লাখ ৫৫ হাজার ২৪ টাকা ৭৫ পয়সা।

নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় এরশাদের বিরুদ্ধে ১০টি মামলা বিচারাধীন ছিল। ৩টি স্থগিত ও ২৭টি ফৌজদারি মামলা থেকে খালাস/অব্যাহতি পেয়েছিলেন এরশাদ। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৪টি মামলা ছিল বিচারাধীন, চারটি স্থগিত আর ২৫টি মামলা থেকে খালাস/অব্যাহতি পান তিনি।

একাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে এরশাদের বিরুদ্ধে একটি বিচারাধীন, পাঁচটি স্থগিত ও ২৭টি থেকে খালাস/অব্যাহতিতে আছেন।

হলফনামায় পেশা হিসেবে ‘সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান’ উল্লেখ করেন এরশাদ। এতে দেয়া তথ্য অনুযায়ী, তার বার্ষিক আয় ১ কোটি ৮ লাখ ৪২ হাজার ২০৬ টাকা। এর মধ্যে ব্যবসা থেকে বছরে আসে ২ লাখ ৬ হাজার ৫০০ টাকা, রাষ্ট্রীয় বিশেষ দূত হিসেবে সম্মানী ১৯ লাখ ৪ হাজার ৬৯৬ টাকা, সাংসদের সম্মানী ১২ লাখ ৬০ হাজার এবং ব্যাংকের পরিচালনা পরিষদের সম্মানী হিসেবে পান ৭৪ লাখ ৭১ হাজার ১০ টাকা।

সাবেক এই সেনা শাসকের অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৫৮ কোটি ২৫ লাখ ১৫ হাজার ২৪ টাকা ৭৫ পয়সা। তাঁর নগদ রয়েছে ২৮ লাখ ৫৩ হাজার ৯৯৮ টাকা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা করা অর্থের পরিমাণ ৫৫ লাখ ৪৯ হাজার ৮৭২ দশমিক ৭৫ টাকা। তাঁর শেয়ার আছে ৪৪ কোটি ১০ হাজার টাকার। এ ছাড়া পোস্টাল/সেভিংস সার্টিফিকেটসহ বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয়পত্রে বা স্থায়ী আমানত বিনিয়োগ ৯ কোটি ২৯ লাখ টাকা; ৫৫ লাখ টাকা মূল্যের একটি ল্যান্ড ক্রুজার জিপ; ১৮ লাখ টাকা মূল্যের নিশান কার; ৭৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা মূল্যের আরেকটি ল্যান্ড ক্রুজার জিপ; ইলেকট্রনিক সামগ্রী ৩০ হাজার টাকার; আসবাবপত্র ৩০ হাজার টাকার; ব্যবসার মূলধন ১২ লাখ ৫১ হাজার ১৫৪ টাকার ও জমি বিক্রয় মূল্য ২ কোটি ৫০ লাখ ৪০ হাজার টাকার।

এরশাদ তাঁর ওপর নির্ভরশীলদের বার্ষিক আয় শূন্য দেখালেও তাঁর স্ত্রীর অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ তার কাছাকাছি। সাবেক এই রাষ্ট্রপতির স্ত্রীর অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৩৬ কোটি ৯২ লাখ ২৪ হাজার ৭১৩ টাকা। এর মধ্যে রয়েছে নগদ অর্থ ২৬ কোটি ২০ লাখ ২৯ হাজার ২৩৩ টাকা; ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা করা অর্থের পরিমাণ ৭৪ লাখ ৮৯ হাজার ৭১৩ টাকা; শেয়ার ৫০ হাজার টাকার; পোস্টাল/সেভিংস সার্টিফিকেটসহ বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয়পত্রে বা স্থায়ী আমানতে বিনিয়োগ ৮ কোটি ২৭ লাখ ৭ হাজার ১৭ টাকা; তিনটি গাড়ির মূল্য ১ কোটি ৫৩ লাখ ২৩ হাজার ৭৫০ টাকা; ১০০ ভরি স্বর্ণালঙ্কারের মূল্য ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা; ইলেকট্রনিক সামগ্রী ৭ লাখ টাকা ও ৮ লাখ টাকা মূল্যের আসবাবপত্র।

এরশাদের স্থাবর সম্পদের পরিমাণ ২ কোটি ৫০ লাখ ৪০ হাজার টাকার। এর মধ্যে রাজধানীর বনানীতে ৭৭ লাখ টাকা মূল্যের একটি দোকান; বারিধারা, বনানী ও গুলশানে তিনটি ফ্ল্যাট রয়েছে। ফ্ল্যাট তিনটির মূল্য ১ কোটি ৭৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা।

সাবেক এই রাষ্ট্রপতির চেয়ে তার স্ত্রীর স্থাবর সম্পদের পরিমাণ বেশি। তার স্ত্রীর নামে স্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৭ কোটি ৩১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। এর মধ্যে রংপুরে ২৬৩.৫ ডিসিমাল কৃষি জমি রয়েছে, যার মূল্য ৩৩ লাখ টাকা। রাজধানীর পূর্বাচলে কৃষি জমি ৭.৫ কাঠা, যার মূল্য ১৮ লাখ ৭৫ হাজার টাকা।

বসুন্ধরা ও গুলশানে তাঁর স্ত্রীর দুটি ফ্ল্যাট ও গুলশানে একটি বাড়ি রয়েছে। বসুন্ধরার ফ্ল্যাটটি ‘পূর্ব সূত্রে পাওয়া’ উল্লেখ করে মূল্য তুলে ধরা হয়নি। আর গুলশানের ফ্ল্যাট ও বাড়ির মূল্য দেখানো হয় ৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা।

এইচ এম এরশাদের এককভাবে ঋণের পরিমাণ দুই ব্যাংকে ২ কোটি ৩২ লাখ ৪ হাজার ৬৫৩ টাকা। এর মধ্যে ইউনিয়ন ব্যাংক লিমিটেডে ৫৬ লাখ ১৯ হাজার ৬৮৯ টাকা এবং ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক লিমিটেডে ১ কোটি ৭৫ লাখ ৮৪ হাজার ৯৪৬ টাকা।

তিনি এর আগে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সাংসদ হওয়ার পর সেসব প্রতিশ্রুতির বড় সাফল্য উল্লেখ করলেও কোনোটিই পূর্ণাঙ্গভাবে পূরণ করতে পারেননি। এর মধ্যে গ্রামীণ রাস্তাঘাট, কালভার্ট, মসজিদ-মন্দির উন্নয়নের ৯৫ শতাংশ, গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচন ও উন্নয়নের ৯০ শতাংশ, মাদক ও সন্ত্রাস নির্মূলের ৯০ শতাংশ, ঢাকা-রংপুর মহাসড়ক উন্নয়নের ৮০ শতাংশ ও শিক্ষার মান উন্নয়নের ৮০ শতাংশ বাস্তবায়ন করেছেন।

বিডি সংবাদ টোয়েন্টিফোর ডটকম/

প্রিন্ট করুন

বিভাগ: রাজনীতি