কারা এই ৭ জঙ্গি, ফাঁসি হলো যেসব অভিযোগে

বিডি সংবাদ টোয়েন্টিফোর ডটকম: ২০১৬ সালের ১ জুলাই প্রথমবার কোনও সংগঠিত জঙ্গি হামলায় স্তম্ভিত হয়ে পড়েছিল গোটা দেশ। হতবাক হয়ে পড়েছিল গোটা বিশ্ব। দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমগুলো লোকহর্ষক সেই হামলার ঘটনা দিনের পর দিন খবরের শিরোনাম করেছিল। বহুল আলোচিত নারকীয় সেই হলি আর্টিজান হামলার তিন বছর পর আজ রায় ঘোষণা হলো। চার্জশিটভুক্ত জীবিত ৮ আসামির মধ্যে ৭ জনের ফাঁসির দণ্ডদেশ দিয়েছেন আদালত।

হামলায় সরাসরি জড়িত নিহত ৫ জঙ্গিসহ এই হামলা মামলার মোট ২১ জনকে আসামি করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে মামলার বিচারকাজ চলাকালে ও পরবর্তীতে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে ১৩ জন মারা যান। জীবিত ৮ জনকে আসামি করে ২০১৮ সালের ২৬ নভেম্বর আদালতে চার্জশিট দেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। এর পর গত এক বছর ধরে চার্জশিটভুক্ত ২১১ জন সাক্ষীর মধ্যে ১১৩ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করে ঢাকার সন্ত্রাস বিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল।

২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে স্প্যানিশ রেস্তোরাঁ গুলিশানের হলি আর্টিজানে ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি দিয়ে হামলায় সরাসরি অংশ নেয়া ৫ জঙ্গি নিবরাজ ইসলাম, খায়রুল ইসলাম ওরফে পায়েল, মীর সামেহ মোবাশ্বের, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ ও শফিকুল ইসলাম ওরফে উজ্জ্বল হামলার পরদিন ২ জুলাই সকালে সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযানে নিহত হন।ব্রেকিংনিউজ

এর পর হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী তামিম চৌধুরী, তানভীর কাদেরী, জাহিদুল ইসলাম, নুরুল ইসলাম মারজানসহ ৮ জন বিভিন্ন সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে নিহত হন।

ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত ৭ আসামি হলেন- জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান, আব্দুস সবুর খান হাসান ওরফে হাতকাটা সোহেল মাহফুজ, আসলাম হোসেন সরদার ওরফে রাশেদ ইসলাম ওরফে আবু জাররা ওরফে র‌্যাশ, হাদিসুর রহমান সাগর, শরিফুল ইসলাম ওরফে খালেদ ও মামুনুর রশীদ ওরফে রিপন। এর মধ্যে মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজানের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ না হওয়ায় তাকে বেকসুর খালাস দেয়া হয়েছে।

একনজরে যেসব অভিযোগে ৭ জঙ্গির ফাঁসি হলো:

১. জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী : গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার পশ্চিম রাঘরপুরের ছেলে রাজীব (২৮) হামলার পরিকল্পনাকারী, হামলাকারীদের প্রশিক্ষণ, অস্ত্র সরবরাহ ও হামলায় সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছিলেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। স্বীকারোক্তিতে রাজীব জঙ্গি সংগঠনে জড়িত থাকার কথা স্বীকার কলেও হলি আর্টিজান হামলায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেন।

২. রাকিবুল হাসান রিগ্যান : পুলিশের দাবি, রাকিবুল হাসান রিগ্যান রাফিউল ইসলাম রাফি, রিপন, হাসান ও অন্তর নামেও পরিচিত ছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি বগুড়ার সদর উপজেলার ইসলামপুরের পশ্চিমপাড়ায়। হলি আর্টিজান হামলার পর রিগ্যান কল্যাণপুরে জাহাজবাড়ির জঙ্গি আস্তানায় অবস্থান নেন। সেখানে ২০১৬ সালের ২৭ জুলাই অভিযানে ১১ জন নিহত হন এবং ওই সময়ই রিগ্যান গ্রেফতার হন। অভিযোগপত্রে রিগ্যানকে নব্য জেএমবির প্রশিক্ষক ও গুলশান হামলায় জড়িতদের প্রশিক্ষণ ও প্ররোচনাকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

৩. আব্দুস সবুর খান হাসান : আব্দুস সবুর খান হাসান (৩৩) ওরফে হাতকাটা সোহেল মাহফুজ নামেও পরিচিত ছিলেন। হলি আর্টিজান হামলা মামলার অভিযোগপত্রে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর সাদিপুর কাবলিপাড়ার ছেলে হাসানকে নব্য জেএমবির সদস্য এবং গুলশান হামলায় লোক, অস্ত্র ও গ্রেনেড সরবরাহকারী হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়। ২০০২ সালে জেএমবিতে যোগ দিয়ে রাজশাহীর বাগমারায় ‘সর্বহারা নিধন অভিযানে’ বোমা বানানোর সময় ডান হাতের কবজি উড়ে যায়। এর পর ভারতে আত্মগোপনে থাকার পর ২০১০ সালে আবারও দেশে ফিরে জেএমবির উত্তরাঞ্চলের দায়িত্ব নেন এবং গুলশান হামলার অন্যতম পরিকল্পনাকারী তামিম চৌধুরীর সঙ্গে নব্য জেএমবিতে যোগ দেন।

৪. আসলাম হোসেন সরদার: আসলাম হোসেন সরদার (২০) ওরফে রাশেদ ইসলাম ওরফে আবু জাররা ওরফে র‌্যাশ নামেও পরিচিত ছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি রাজশাহীর পবার নওহাটা মথুরায়। গুলশান হামলাকারীদের নির্দিষ্ট জায়গার পৌঁছে দেয়া, ঘটনাস্থলে রেকি, হামলার বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও হামলার আগে বুড়িগঙ্গা নদীতে বোমা বিস্ফোরণের অভিযোগ আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে। ২০১৪ সালে নব্য জেএমবিতে যোগ দেয়া আসলামকে ২০১৭ সালের ২৮ জুলাই গ্রেফতার করা হয়।

৫. হাদিসুর রহমান সাগর : জয়পুরহাট সদর উপজেলার কাদোয়া কয়রাপাড়া গ্রামের ছেলে সাগরকে (৩৫) গুলশান হামলাকারীদের ঝিনাইদহে মেস ভাড়া করে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দেয়া, অর্থ লেনদেন, অস্ত্র-গ্রেনেড সরবরাহ ও হামলায় সহায়তাকারী হিসেবে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়। আলিম পড়ার সময় ২০০১ সালে জেএমবিতে যোগ দেন সাগর। ২০১৩ সালে নব্য জেএমবিতে যোগ দিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের সামরিক কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৮ সালের ২১ মার্চ বগুড়ার শিবগঞ্জ থেকে সাগরকে গ্রেফতার করা হয়।

৬. শরিফুল ইসলাম ওরফে খালেদ :  শরিফুলের (২৭) গ্রামের বাড়ি রাজশাহীর বাঘমারা উপজেলার শ্রীপুরের খামারপাড়ায়। গুলশান হামলার অভিযোগপত্রে শরিফুলকে হামলার পরিকল্পনাকারী, হামলাকারীদের প্রশিক্ষণ, প্ররোচনা ও ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেয়ার অভিযোগ আনা হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র শরিফুল তৃতীয় বর্ষে পড়ার সময় ২০১৩ সালে জেএমবিতে যোগ দেন। ২০১৯ সালের ২৫ জানুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।

৭. মামুনুর রশীদ ওরফে রিপন : বগুড়ার নন্দীগ্রামের শেখের মাড়িয়া এলাকার ছেলে রিপন (৩০) গুলশান হামলা পরিকল্পনার চূড়ান্ত বৈঠকে অংশ নেন ও হামলাকারীদের অস্ত্র সরবরাহ করেন। চার্জশিটে বলা হয়, হাদিসুর ও রিপন তিনটি একে-২২ রাইফেল, গুলি, চারটি গ্রেডেন, দুটি পিস্তল কল্যাণপুরে নিয়ে এসে মারজানের মাধ্যমে তামিমের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন। ২০১৫ সালে নব্য জেএমবিতে যোগ দেয়া রিপনকে ২০১৯ সালের ২০ জানুয়ারি গাজীপুরের বোর্ডবাজার এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়।

অন্যদিকে খালাস পাওয়া বড় মিজানের (৬০) গ্রামের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের হাজারবিঘি চাঁনপুরে। ২০১৬ সালের ২ নভেম্বর রাজধানীর দারুস সালাম থানা এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। গুলশাল হামলায় ব্যবহৃত বিস্ফোরক সরবরাহের অভিযোগ আছে বড় মিজানের বিরুদ্ধে। যদিও স্বীকারোক্তিতে তিনি নিজেকে একজন মাছ ব্যবসায়ী ও নামের মিল থাকায় তাকে গ্রেফতার হয়েছেন বলে দাবি করেছিলেন।

প্রিন্ট করুন

বিভাগ: জাতীয়,ঢাকা