কেন গন্তব্য পশ্চিমবঙ্গ

বিস্ময়ে ভরা এই রাজ্যটিতে এসে কিছুটা সময় কাটিয়ে গেলেই এই প্রশ্নটির যথোপযুক্ত উত্তর পাওয়া সম্ভব। ইতিহাস ও ঐতিহ্যে জড়িত রাজ্যের অধিবাসীরা কিছু সাংস্কৃতিক মূল্যমানকে আত্মস্থ করে নিয়েছে যার সহায়তায় তারা কেবলমাত্র অপেক্ষাকৃত ভাল মানুষই নয় বরং ভারতে সর্বোত্তম শ্রমশক্তিতে পরিণত হতে পেরেছে। এরই সঙ্গে যদি সেই বিপুল সুযোগ সুবিধার সম্ভার, যা পশ্চিমবঙ্গে আগত সকলকেই দেওয়া হয়, তাকে যুক্ত করা যায়, তাহলে পর্যটক বা লগ্নিকারি যেই হন না কেন- পশ্চিমবঙ্গ তাঁর কাছে প্রকৃত অর্থেই একটি নিরুপদ্রব ও নিরাপদ আশ্রয়স্থল। তাই আসুন, আর নিজেই দেখুন আর বিস্ময়াবিষ্ট হতে থাকুন।

পশ্চিমবঙ্গের শিল্পকলা ও সংস্কৃতি

art & culture westbengal

পশ্চিমবঙ্গের কোনও প্রত্যন্ত প্রান্তে পর্যবেক্ষন করলে দেখতে পাওয়া যাবে যে প্রতি ঘরে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা কোনও বা কোন পাঠ্যতালিকা বহির্ভূত কার্যকলাপে যথা সাহিত্য, সঙ্গীত, নৃত্যকলা ও চলচ্চিত্র বিষয়ে মনোনিবেশ করেছে। এমন বাড়ি খুঁজে পাওয়া খুবই দুষ্কর যেখানে পরিবারের সদস্যরা খেলাধুলা বিষয়ে কুশলতা অর্জন করেনি। পরিবারের কন্যা সদস্যা বা মহিলা সদস্যা হলে নিশ্চিত ভাবে বলা যায় যে তারা অন্তত দুধরনের নৃত্য শৈলীতে পারদর্শী হবেন। এর কারন হল পশ্চিমবঙ্গকে প্রায়শই সকল প্রকার সাংস্কৃতিক বৈশিষ্টের কেন্দ্রভুমি হিসেবে অবিহিত করা হয়। রাজ্যের রাজধানীকে বলা হয় দেশের সাংস্কৃতিক রাজধানী।

পশ্চিমবঙ্গ কেন এই শিরপা অর্জন করেছে তাঁর পেছনে অনেকগুলো কারন আছে। ইতিহাস ও কালানুক্রমিক ঘটনাপ্রবাহের দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায় যে, প্রতিটি বহিরাক্রমন ও বৈদেশিক অনুপ্রবেশের ফলে সংস্কৃতির ভান্ডারে নতুন নতুন উপাদান সন্নিবিষ্ট হয়েছে এবং ধীরে ধীরে স্বতঃই জনসাধারণের  পালনীয় ও আচরনিয় বহুবিধ রীতিনীতি ও অভ্যাস নিয়ে গড়ে ওঠা একটি ব্যবস্থা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। একটি বিষয় এ প্রসঙ্গে মনে রাখা দরকার। পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক উত্তারাধিকারের ব্যাপক সাদৃশ্য রয়েছে বাংলাদেশের সঙ্গে। দার্জিলিং – এর পাহাড়ি অঞ্চল ও হিমালয়ের পার্বত্য অঞ্চলের দিকে যত অগ্রসর হওয়া যাবে মানুষের সাংস্কৃতিক রীতিনীতির মধ্যেই ততই তীব্র পরির্বতন লক্ষ্য করা যাবে।

 

art and culture westbengal

কলকাতার নিজস্ব সামাজিক কাঠামোটি অভিনব, যা জনসাধারণের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিকাশের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে। কলকাতার প্রতিটি এলাকা বা পাড়ায় একটি করে ক্লাব আছে। ক্লাবের লাগোয়া খেলার মাঠ। এই সমস্ত ক্লাবগুলিতে নৃত্য, শিল্পকলা, সঙ্গীত- শিক্ষা ক্লাসের আয়োজন করা হয়ে থাকে। ক্লাবগুলি আবার বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সংগঠিত করে, যেখানে পাড়া প্রতিবেশীর সামনে মানুষ তাদের শৈল্পিক সামর্থের প্রদর্শন করতে সমর্থ হয়। ক্লাব সংস্কৃতির আরও একটি বড় দিক হল এই যে, দিনের শেষে পাড়ার বয়োজ্যেষ্ঠরা এসে এখানে পরস্পরের সাথে মিলিত হন, এবং নানা ধরনের চলতি ঘটনা – রাজনীতি থেকে খেলাধুলা, দর্শন বা বলা যেতে পারে এই পৃথিবীর অভ্যন্তরের যে কোনও বিষয় নিয়ে চায়ের পেয়ালায় তুফান তুলে দিতে পারেন।

এই অভিনব আচার-রীতি নতুন নতুন ভাবনার জন্ম দেয়, সামাজিক প্রেক্ষাপটের মূল্যায়ন করে এবং বৈচিত্রময় বিষয়াবলির উপর জীবনবীক্ষা গড়ে তোলে। আর এসব কিছুরই মিলিত অবদানে পুষ্ট পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক আধারস্থল অতঃপর সঞ্চারিত হয়েছে ভারতীয় সংস্কৃতিতে। বিগত কয়েক শতাব্দী জুড়ে এই বিনম্র রাজ্যের মধ্যে থেকেই উঠে এসেছে অনেক বড় লেখক, কবি, নৃত্যশিল্পী, চিত্রকর, ভাস্কর, চলচ্চিত্রনির্মাতা ও গায়কেরা।

সাহিত্য

বাংলা পশ্চিমবঙ্গের প্রধান ভাষা। এক গভীর ঐতিহ্যের উত্তারাধিকার মন্ডিত এই ভাষা এযাবৎ সৃষ্ট সমস্ত ভাষাগুলির মধ্যে অন্যতম গভীর ও জটিল। এই ভাষায় যথার্থ বুৎপত্তি অর্জন করতে বছরের পর বছর সময় লেগে যায়। তারপরেও ভাষা শিক্ষা যখন শেষ হয় তখন মনে হয় সেটা বিশাল মহাসমুদ্রের কয়েক বিন্দু জলকণার মত। এই হল বাংলা ভাষা! শৈশব থেকে বাঙালিরা চর্যাপদ থেকে শুরু করে মঙ্গল কাব্য, ঠাকুরমার ঝুলি ও আরও অনেক মহত্তম সাহিত্যকর্মের সঙ্গে পরিচিত হয়।

art and culture westbengal

অতি শৈশবেই সূত্রপাত ঘটে ভাষার সঙ্গে প্রনয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, কাজী নজরুল ইসলাম, মাইকেল মধুসূদন দত্ত এবং শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ অসামান্য সাহিত্যস্রষ্টার জন্মস্থান হল এই পশ্চিমবঙ্গ। ঔপনিবেশিকতার যুগ থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত বাংলার সাহিত্য কীর্তির মধ্য দিয়ে সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছে। স্বামী বিবেকানন্দ ও রাজা রামমোহন রায় – এর রচনা এক্ষেত্রে প্রকৃষ্ঠ দৃষ্টান্ত। বাংলার নবজাগরণের পুরোধা ব্যক্তি বর্গের মধ্যে এঁরা অগ্রগণ্য। বিংশ শতাব্দীর উত্তরপর্বে বাংলা সাহিত্যের জগতে উত্তর-আধুনিক ভাবনার বিচ্ছুরণ ঘটে যেসব লেখকের রচনার হাত ধরে তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মানিক বন্দোপাধ্যায়, মহাশ্বেতা দেবী, সমরেশ মজুমদার প্রমুখ।

থিয়েটার ও চলচ্চিত্র

why westbengal

চলচ্চিত্রের প্রতি পশ্চিমবঙ্গের ভালবাসা দীর্ঘদিনের। অনেক বরেণ্য চলচ্চিত্র নির্মাতার উত্থান এখানে দেখা গিয়েছে। বহু উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্র সৃষ্টির জন্যে আ্যকাডেমি পুরষ্কারে ভূষিত সত্যজিত রায় এবং তপন সিংহ, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেনের মত নির্দেশক বাংলার চলচ্চিত্র জগতকে আলোকিত করেছে। কলকাতার টালিগঞ্জ ক্ষেত্র যা টলিউড নামে খ্যাত, সেখানে প্রধান প্রধান ফিল্ম স্টুডিয়ো গুলি অবস্থিত। একে অন্যতম ব্যস্ত বাণিজ্য কেন্দ্র বলা হয়। বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত, অপর্ণা সেন, ঋতুপর্ণ ঘোষ প্রমুখ চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সৃষ্টি সারা বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হয়।

সংগীত ও নৃত্য

সঙ্গীত প্রসঙ্গে বলা যায় যে পশ্চিমবঙ্গ রবীন্দ্রসঙ্গীতের জন্মভূমি। সঙ্গীতের এই ধারাটিকে জনপ্রিয় করেছেন স্বয়ং কবি ও গীতিকার- রবীন্দ্রনাথ। সাহিত্যের জগতে তাঁর সুবিশাল অবদানের জন্যে তিনি নোবেল প্রাইজ লাভ করেন। কিন্তু অন্য স্থানের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গের স্বকীয়তা এইখানেই যে, অজস্র লোক সঙ্গীত ও লোক নৃত্য শৈলীর উপস্থিতি। উদাহরণ হিসেবে বীরভূম জেলার বিভিন্ন প্রান্তে বাউল গানের সংস্কৃতির উল্লেখ করা যায়; বাউল- ফকিররা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে যৎসামান্য বাদ্য যন্ত্রের অনুষঙ্গে প্রকৃতি ও অন্যান্য বিষয় অবলম্বন করে গান করে বেড়ায়। এছাড়া আছে কীর্তন কিংবা গাজনের গানের ধারা। নৃত্যের কথা বলতে গেলে পুরুলিয়ার ছৌ- নৃত্যের কথা বলতে হবে যা সকলের ক্ষেত্রেই অবশ্য দর্শনীয় তালিকায় পড়বে।ছৌ- শিল্পীরা বর্ণময় মুখোশে আবৃত হয়ে নানাবিধ সাবেকী ঐতিহ্য মেনে নৃত্য পরিবেশন করেন। কিন্তু জনসাধারণের  রুচির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিদেশি প্রভাব পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতিতে অনুপ্রবিষ্ট হয়েছে। বিশেষ বিশেষ শহরের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে রক ও পপ সঙ্গীতের অনুষ্ঠান জনপ্রিয় হয়েছে।

শিল্পকলা

শিল্পকলার কথায় আসা যাক। বাংলার নিজস্ব একটি চিত্রশিল্প ও ভাস্কর্যশিল্পের ধারা আছে। ঔপনিবেশিক শাসনাধীন থাকার সময় এর উৎপত্তি। কলকাতা ও শান্তিনিকেতনে এর উৎপত্তির শিকড় নিহিত আছে। শিল্পের এই ধারা বা আন্দোলন, যে নামেই একে অভিহিত করা হোক না কেন, তা ছিল স্বদেশী আন্দোলনের ফলশ্রুতি। এর পথিকৃৎ ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পরবর্তীকালে অনেক শিল্পীর আগমন ও নির্গমন ঘটেছে। প্রত্যেকেই তাঁর নিজস্ব শিল্পধারাটিকে বাংলার সুবিশাল শিল্পকলা ও ভাস্কর্যের ভান্ডারে যুক্ত করেছেন। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন কালিপদ ঘোষাল, নন্দলাল বসু, যামিনী রায়, রামকিঙ্কর বেজ প্রমুখ উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক।

উৎসব

why westbengal

বাংলার ইতিহাস জানতে হলে দুর্গাপূজার উল্লেখ অবশ্যই করতে হবে। এটি বাংলার বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব এবং পালিত হয় সপ্তাহ জুড়ে। এই উৎসবটি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ এবং সকলে এর দিকে এতটাই ঔৎসুক্য নিয়ে তাকিয়ে থাকে যে, বছরের দুর্গাপূজার সময়তাটে গোটা রাজ্যই ছুটির আবহে ঢেকে থাকে। কিন্তু দুর্গা পূজা ছাড়াও পৌষ মেলা ঈদ, দোলযাত্রা ইত্যাদি উৎসব, নবান্ন, বুদ্ধ পূর্ণিমা এবং বাঙ্গালির নববর্ষ পয়লা বৈশাখ—এর মতো অন্যান্য অনেক উৎসব এখানে পালন করা হয়।

প্রিন্ট করুন

বিভাগ: ইতিহাস