গোপালগঞ্জে জনবসতির মধ্যে অর্ধশতাধিক ইটের ভাটা, প্রশাসন নীরব

গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি: গোপালগঞ্জে ফসলি জমি ও জনবসতি এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে অসংখ্য ইট ভাটা। গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার পুখরিয়া এলাকার এসব ইটভাটা গড়ে উঠেছে। প্রত্যেক ইট ভাটার মধ্যে স্থাপন করা হয়েছে করাত কল। হুমকির মুখে কৃষি আবাদি জমি এবং জনস্বাস্থ্য ও শিশু স্বাস্থ্য নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় এলাকাবাসী।

গোপালগঞ্জের বহুল পরিচিত পুখরিয়া গ্রামে একটি বাজার, দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি কিন্ডার গার্ডেন স্কুল ও একটি মাদ্রাসা রয়েছে। বাজার সংলগ্ন দু’পাশে একাধিক ইটের ভাটা গড়ে উঠায় প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং কিন্ডার গার্ডেনের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা খুবই ক্ষতিকর সম্মুখীন হচ্ছে। ভাটার চারপাশ দিয়ে রয়েছে জনবসতি ও ফসলি জমি। কয়েক বছর ধরে এ রকম একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বছরে ছয় মাস ইট পোড়ানো হচ্ছে।

গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার পুখরিয়া গ্রামের প্রায় সব জায়গায় রয়েছে ইটের ভাটা। ইট প্রস্তুত ও ভাটা নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৩ তে বলা আছে আবাসিক এলাকা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাট বাজার ও ফসলি জমির এক কিলোমিটারের মধ্যে ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না। এছাড়া কোনো সড়ক ও মহাসড়কের অর্ধ কিলোমিটার দূরত্বে ইট ভাটা স্থাপন করতে হবে। কিন্তু এই আইন অমান্যকরে পুখরিয়ায় গড়ে উঠেছে অর্ধশতাধিক ইটের ভাটা।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এখানে এক কিলোমিটারের মধ্যে স্থাপন করা হয়েছে দুই-তিনটি ইটভাটা। পুখরিয়ায় পাভেল ব্রিকস নামে দুটি, প্রগতি ব্রিকস, এবং গাজী ভাটা রয়েছে। ২০১০ সালে পরিবেশ অধিদপ্তর ছাড়পত্র ও জেলা প্রশাসন ইট পোড়ানের লাইসেন্স দেয়। কিন্তু এসবিআই ব্রিকস, সুপার ব্রিকস, পদ্মা ব্রিকস, স্টার ব্রিকস, রাজ ব্রিকস, সোহাগ ব্রিকস, লালপরি ব্রিকস, খান ব্রিকস, গাজি ব্রিকস, বিএইসআর ব্রিকস, জাহেদা ব্রিকস, সিটি ব্রিকস, সিটি ব্রিকস, হাশেম ব্রিকস, জেড ব্রিকস, মুন্সি ব্রিকস, শেখ ব্রিকস, শিয়ার ব্রিকস, কাজি ব্রিকসসহ প্রায় অর্ধশত ইট ভাটার ইট পোড়ানোর কোনো লাইসেন্স নেই। কর্তৃপক্ষের আইন অমান্য করে ইট পুড়িয়ে যাচ্ছে অবাধে। এমন অবস্থা গোপালগঞ্জের ৯৯%এর বেশি ইট ভাটার।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, গোপালগঞ্জ জেলার পুখরিয়া গ্রামেই রয়েছে ৫৪টি ইট ভাটা। যার মধ্যে ৩টি বাদে বাকি কোনো ইট ভাটার পরিবেশগত ছাড়পত্র ও ইট পোড়ানের লাইসেন্স নেই।

স্টার ব্রিকস এর মালিক মোজাহিদ মোল্যা বলেন, সবাই ইট ভাটা চালাচ্ছে তাই আমরাও চালাচ্ছি। তাছাড়া আমরা জেলা প্রশাসকের এলআর ফান্ডে পঞ্চাশ হাজার টাকা জমা দিয়ে ভাটায় ইট পোড়ানোর কাজ শুরু করেছি। আমাদের কাছ থেকে প্রতি কিস্তিতে এক লাখ ছাপ্পান্ন হাজার টাকা ভ্যাট নেয়া হয়। তিনি স্থানীয় কিছু নেতা ও কর্মকর্তার দোহাই দিয়ে আরো বলেন, তারা আমাদের বলেছেন কাজ করতে বাকি কাগজপত্র তারাই ঠিক করে দেবেন। কিন্তু দুই বছর হলো প্রায় ত্রিশ থেকে চল্লিশটি ইটের ভাটা গড়ে উঠেছে যাদের কোনো দপ্তরের ছাড়পত্র বা অনুমতি পত্র নেই।

পুখরিয়া গ্রামের কেরামত আলি শেখ বলেন, পুখরিয়ায় এবছর এবং বিগত বছর এ.পি.বি ব্রিকস, কে.এস.বি ব্রিকস, মোল্যা ব্রিকস, আয়ুব আলী ব্রিকস, লালপরি ব্রিকস, টি.এম.ব্রিকস, কিং ব্রিকস, জায়েদা ব্রিকস, হাসেম ব্রিকস, সুপার ব্রিকস, মিতু ব্রিকস, রাজ ব্রিকস, পদ্মা ব্রিকস, কে.বি ব্রিকস, খান ব্রিকস, ভাই ভাই ব্রিকস, খান ব্রিকস, আর.এম.এন.ব্রিকস, মাস্টার ব্রিকসসহ প্রায় ৪০-৪৫টি ভাটা স্থাপন করা হয়েছে। এসকল ইট ভাটার পরিবেশগত ছাড়পত্র ও ইট পোড়ানোর লাইসেন্স নেই।
এছাড়া এই ভাটার তৈরি করা হয়নি চিমনি। ড্রাম চিমনি দিয়ে পোড়ানো হচ্ছে ইট। প্রতিটি ইট ভাটার মাঝে স্থাপন করা হয়েছে করাত কল। করাত কল দিয়ে কাঠ চেরাই করে সেই কাঠ দিয়ে ইট পোড়ানো হয়। ইট ভাটার চারদিকে ডাল, আখ, পেঁয়াজ, রসুন, সবজি, ধান, গম, চাষ করতেন স্থানীয় কৃষকেরা। ইট ভাটার কালো ধোঁয়া ও ধুলোবালুতে ফসলের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। এছাড়াও কালো ধোঁয়ায় নারকেল গাছের নারকেল ছোট হয়ে যাচ্ছে। আম, নারকেল সুপারি ও অন্যান্য ফলন একবারেই কমে যাচ্ছে।

পুখরিয়ার কৃষক ওসমান আলি শেখ বলেন, এ বছর আমি ৫০ শতাংশ জমিতে মসুর ডালের আবাদ করেছি। কিন্তু ইট ভাটার কালো ধোঁয়ার জন্য ও ধুলা বালিতে মসুরির ফলন ভালো হয়নি। এখন কৃষক চাষাবাদ করার জমিই পাচ্ছে না। আমাদের এলাকায় প্রায় সব জমিতে ইট ভাটা স্থাপন করা হয়েছে।

পুখরিয়ার মনিরুল ইসলাম বলেন, জেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ পরিদর্শন করেছে। তারা এসে বলেছেন যে সকল ভাটার লাইসেন্স নেই, সেগুলো চালানোর কোনো বৈধতা নেই। এমন কি যে সকল ইট ভাটার চিমনি তৈরি করা নেই ড্রাম চিমনি দিয়ে ইট পোড়াচ্ছে তারা অবশ্যই আইন বিরোধী কাজ করছে আইনের প্রতি সম্মান প্রর্দশ করে এখান থেকে কয়েকটা ভাটার চিমনি নামিয়ে দিয়ে ছিলেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা কিন্তু নামানোর পর ভাটার মালিকেরা নিজেদের আইনে আবার চিমনি উঠিয়ে কাজ শুরু করেন এর নেপথ্যে কি কারণ তা আমাদের জানা নেই। এলাকাটিতে কোনো ভাটার অনুমমোদন নেই কিন্তু অবাধে ইট পুড়িয়ে যাচ্ছে। রাতের বেলা এই এলাকায় এক থেকে দেড়শত মন গাছ ট্রাকে করে আনেন এবং প্রত্যেকের নিজস্ব ভাটার মধ্যে করাত কল রয়েছে তা দিয়ে চেরাই করে কাঠ দিয়ে ইট পোড়ান। এগুলো উপর মহল দেখেন কিন্তু তাদের কোন মাথা ব্যাথা নেই। সমস্যায় ভুগছেন এলাকাবাসী। এই এলাকায় ফসলি জমিতো নেই, তাছাড়া শ্বাসকষ্ট রোগ বেড়েই চলেছে।

পুখরিয়া গ্রামের আসাদ মোল্লা বলেন, ডিসি অফিসের এলআর ফান্ডে প্রতিটি ভাটা থেকে পঞ্চাশ হাজার করে টাকা নেওয়া হয়েছে এবং প্রতি কিস্তিতে এক লাখ আটান্ন হাজার টাকা করে বছরে মোট প্রায় পাঁচ লাখ টাকা আমাদের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে ভ্যাট বাবদ। তাহলে অনুমোদন যদি নাই দিবেন তাহলে এই টাকা নিয়েছেন কিসের ভিত্তিতে।

পুখরিয়া গ্রামের সাগর হোসেন রানা বলেন, আমাদের গ্রামে বসবাস করার মত কোনো অবস্থা নেই। গ্রামের রাস্তা দিয়ে ধুলোবালুর জন্য হাটা যায় না। তাছাড়া কালো ধোয়া ও ধুলাবালু ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের শারীরিক ব্যাপক ক্ষতি করছে। গ্রামের কোনো বাড়িতেই গাছের কোন পাতা পর্যন্ত দেখা যায়না ধুলা-ময়লার ও কালো ধোয়ার জন্য। সব সময় যেন অন্ধকার অবস্থা থাকে।

গোপালগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সমীর কুমার গোস্বামী বলেন, ইট ভাটার পরিবেশগত ছাড়পত্র দেওয়ার আগে কৃষি বিভাগ একটি তদন্ত প্রতিবেদন প্রদান করেন তদন্ত শেষে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তারা একটি প্রত্যয়ন পত্র প্রদান করে থাকেন। ফসলি জমিতে ইট ভাটা স্থাপন করতে হলে অবশ্যই কৃষি বিভাগের অনুমোদন পত্র প্রয়োজন। কিন্তু এই সমস্ত এলাকায় একর পর এক ইট ভাটা স্থাপন করে চলছে আমাদের কাছে এখন পর্যন্ত কোন লোক আসেনি তবে কৃষি জমি কেটে বিগত বছর ও এই বছরে প্রায় গড়ে তোলা হয়েছে চল্লিশ থেকে পয়তাল্লিশটি ইটভাটা। এগুলো কাদের অনুমতিতে করা হয়েছে আমার জানা নেই। আমাদের খাদ্যে সয়ংসম্পূর্ণ থাকতে হলে কৃষি জমিকে অক্ষত রাখতে হবে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের ফরিদপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ের উপ পরিচালক লুৎফর রহমান বলেন, ইট প্রস্তুত ও ইট ভাটা স্থাপন নিয়ন্ত্রণ আইন ২০১৩ অমান্যকারীকে কারাদণ্ড দেওয়ার ও অর্থদণ্ড করার বিধান রয়েছে। জনবসতি, ফসলি জমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হাট-বাজারের পাশে ইট ভাটার পরিবেশগত ছাড়পত্র প্রয়োজন। অনুমোদন ছাড়া কি ভাবে ইট ভাটা স্থাপন করা হয়েছে তা আমার জানা নেই। তাছাড়া জেলা প্রশাসক ইট পোড়ানোর লাইসেন্স প্রদান করেন। তিনি চাইলে আইন অমান্যকারী ইট ভাটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেন।

গোপালগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. আব্দুল্লাহেল বাকী বলেন, যে ইট ভাটার লাইসেন্স নেই, সে ইট ভাটাগুলোর বিরুদ্ধে খুব দ্রুত ব্যবস্থা নেয়া হবে। গোপালগঞ্জ অনেক ভাটা রয়েছে যাদের কোনো অনুমোদন নেই।

প্রিন্ট করুন

বিভাগ: ঢাকা,সারাদেশ