ঘুরে আসুন ভাওয়াল রাজার দেশ গাজীপুর

ইতিহাস অনলাইন ডেস্ক : ঢাকার কাছে পিঠে বেড়ানোর জন্য মনোরম স্পট জয়দেবপুর। জয়দেবপুরের পাশেই গাজীপুর। জেলা শহর গাজীপুর বেশ সাজানো-গোছানো এখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ঐতিহাসিক কীর্তি। দিল্লির সম্রাট মুহম্ম বিন তুঘলকের শাসনামলে পালোয়ান গাজী নামক জনৈক মুসলমান বীর এ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন। পরবর্তী সময়ে এ ই পালোয়ান গাজীর নামানুসারে এলাকার নাম হয় ‘গাজীপুর’।
ঢাকা হতে সকালে গিয়ে সন্ধ্যায় ফিরে আসা অর্থাৎ একটি দিন জয়দেবপুর এলাকায় বেড়ানো সে এক প্রবল আনন্দ। এখানে সর্বত্রই সবুজে সবুজে আচ্ছন্ন। দেখবেন কতনা প্রজাতির গাছগাছালি। কত না ফুলের বাগান। কৃষ্ণকলি, সন্ধ্যামণি, গোলাপ, চামেলি, কেয়া, জুঁই, কামিনী, রাজনীগন্ধা, হাসনাহেনা ফুটে সর্বত্রই এক মোহময় অবস্থার সৃষ্টি করেছে।
ঢাকা থেকে গাজীপুর ও জয়দেবপুর যাওয়ার জন্য সরাসরি বাস রয়েছে। সময় লাগে ৪০ মিনিট। ইচ্ছে করলে প্রাইভেটকার নিয়েও যেতে পারেন। ফার্মগেট, মহাখালী, গুলিস্তান, প্রেসক্লাব, মালিবাগ, মতিঝিলের যে কোনো জায়গা বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়ালেই গাজীপুর ও জয়দেবপুর যাওয়ার পরিবহন পেয়ে যাবেন।
গাজীপুরের কৃতী সন্তান হলেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক আবু জাফর শামসুদ্দীন। তাজউদ্দিন আহমদ ছিলেন আইনজীবী, রাজনীতিক বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী। জন্ম ১৯২৫ সালে। ঢাকা জেলখানায় তাঁকে ১৯৭৫ সালে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। সেই হত্যার সুবিচার এখন পর্যন্ত তাঁর সন্তানরা পায়নি।
কবি গোবিন্দ চন্দ্র দাস ভাওয়ালের জয়দেবপুর ১৮৫৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ভাওয়াল রাজ স্টেটের ম্যানেজার প্রখ্যাত সাহিত্যিক রায় বাহাদুর কালী প্রমথ ঘোষের অধীনে গোবিন্দ চন্দ্র দাস রাজস্টেটের কর্মচারী ছিলেন। ১৯১৮ সালে তিনি মারা যান। কবির কাব্যগ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘ফুল চন্দন’।
গাজীপুরে আছে ভাওয়াল রাজার বাড়ি, জাতীয় উদ্যান, কৃত্রিম লেক, সোনাভানের মাজার, মীরজুমলার পুল (টঙ্গী)। রাত্রি যাপন করার জন্য জয়দেবপুরে আবাসিক হোটেল রয়েছে।
জয়দেবপুরের অন্যতম আকর্ষণ ভাওয়ালের রাজবাড়ি। এটি এখন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়। রাজপ্রাসাদ সংলগ্নে একটি দীঘি দেখবেন। এখানে একদা রানীরা গোসল করতেন। কিছু সময়ের জন্য দীঘির পড়ে বসতে পারেন। রাজদরবার ঘুরে দেখুন।
ভাওয়াল রাজবাড়িকে নিয়ে আছে অনেক কাহিনী। রাজা রমেন্দ্রনারায়ণের সঙ্গে তার স্ত্রী বিভাবতীর কোনো আন্তরিক সম্পর্ক ছিল না। রানী বিভাবতী পরকীয় প্রেমে আবদ্ধ ছিলেন তাদেরই রাজকর্মচারী ডা. আশুতোষের সঙ্গে। কুমার রমেন্দ্র জানতেন না। এ ঘটনা। দীর্ঘদিন ধরে চলে আশুতোষ ও রানীর এ সম্পর্ক। রানীর সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে রাজাকে দার্জিলিং-এ গিয়ে হাওয়া বদলের কথা জানালেন ডাক্তার দার্জিলিং-এ গিয়ে রাজাকে তিনি ওষুধের নাম করে বিষপান করালেন। বিষ খেয়ে রাজা অচেতন হলেন। অতঃপর তার দেহটা সৎকারের জন্য পাঠিয়ে দেয়া হলো চিতায়।
এদিকে প্রচ- বর্ষণে শবদেহ-বহনকারীরা মৃতগে দাহ না করেই ফিরে এল। রানী বিভাবতী জেনেছিলেন দাহ সম্পন্ন হয়েছে। রাজা কিন্তু আসলে মারা যাননি। জ্ঞান ফিরে তিনি রানীর সঙ্গে দেখা না করে সন্ন্যাসী জীবন বেছে নিলেন। বহু বছর পরে রাজা জয়দেবপুরের ভাওয়ালে আসেন এবং হারানো রাজত্ব ফিরে পান।
জয়দেবপুরে দেখবেন সুবিশাল বনরাজির সমারোহ। এই বনে রয়েছে অসংখ্য গজারি গাছ। এর ছায়াতলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে ইচ্ছে হবে। এর সংলগ্নেই ‘ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান’, যার অপর নাম ‘ন্যাশনাল পার্ক’। এটি রাজেন্দ্রপুরে অবস্থিত। এখানে রয়েছে কৃত্রিম লেক। নৌকাতে করে এই লেকে বেড়াতে পারবেন। ন্যাশনাল পার্কে আছে মহুয়া, কাঞ্চন, পলাশ, শিমুল, অবকাশ, মালঞ্চ, শাপলা, অবিরামসহ কয়েকটি পিকনিক স্পট। অক্টোবর থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত রাজেন্দ্রপুর, শ্রীপুর এবং এর আশপাশে বনে গিয়ে বনভোজন করায় দারুণ আনন্দ রয়েছে। একই সুযোগে দেখা হবে শাল-গজারির বন। একদা এই বনে অসংখ্য বন্যপ্রাণীর আবাস ছিল। কিন্তু শিকারিদের কারণে ময়ূরসহ অসংখ্য প্রজাতির পাখি আজ চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
রাজেন্দ্রপুর, শাওলনা, শ্রীপুরের বনে গাছগাছালি দেখবেন, কিন্তু বন্যপ্রাণী এখন আর চোখে পড়বে না। ন্যাশনাল পার্ক আর হ্রদে বেড়ানোর পরে শ্মশানঘাটে আসুন। এখানে রয়েছে ভাওয়াল রাজার সাতপুরুষের স্মৃতিস্তম্ভ। সাতটি বড় আকারের যজ্ঞ দেখে অভিভূত হবেন। অপরূপ ঝলমলে এসব স্তম্ভ দেখে চোখ আর মন ভরে যাবে। এখানের স্মৃতিস্তম্ভ একটি দুর্লব ঐতিহাসিক নিদর্শন বটে। দেখবেন এর সুন্দর স্থাপত্যরীতি, অপরূপ গঠনবিন্যাস, মার্জিত শিল্পচাতুর্য। সর্বোপরি স্মৃতিসৌধের গায়ে পৌরাণিক চিত্র অঙ্কিত অসংখ্য টেরাকোটা ফলক দ্বারাও আচ্ছাদিত এসব স্মৃতিসৌধ।
শ্মশানঘাটের পরে একটু দূরে গেলেই দেখবেন শাল-গজারি বন। জয়দেবপুরের কালীমন্দিরটিও দেখার মতো। অপরূপ ঝলমলে ওই মন্দির দেখে বারবার তাকিয়ে থাকবেন।
রানী বিলাসমনি সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়টি বহু পুরনো, এটিও ঘুরে দেখার মতো।
জয়দেবপুর দুটি রথও দেখবেন। একটি ভাওয়াল রাজাদের আমলের এবং অপরটি সাম্প্রতিককালের। জয়দেবপুরে রথমেলার সূচনা গটে খ্রিস্টীয় ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যায়ের কিছু পরে ভাওয়াল রাজবংশের মাধ্যমে। রাজা কালীনারায়ণ রায় চৌধুরী জয়দেবপুরের রথমেলাটির প্রচলন করেন।
গাজীপুরে আরো দেখবেন মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি, সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেস।, সমরাস্ত্র কারখানা, ডিজেল, প্ল্যান্ট, বিআরটিসির কেন্দ্রীয় মেরামত কারখানা, আণবিক শক্তিকেন্দ্র প্রভৃতি প্রতিষ্ঠান। এ ছাড়াও দেখবেন ধান গবেষণা কেন্দ্র, কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, পাট গবেষণা কেন্দ্র, শালনা উদ্যান।
জয়দেবপুরের আরে আকর্ষণ স্বাধীনতা সংগ্রামে বীর সৈনিকদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধ। আরো দেখবেন অতন্দ্র প্রহরী মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত একজন সৈনিরে মূর্তি এবং সামরিক জাদুঘর।
জয়দেবপর থেকে শেলাটি বেশিদূরে নয়। এক সময়কার পালবংশের সামন্তরাজা ও শিশুপালের রাজধানী ছিল এই শেলাটি। সারাদিনের জন্য বেড়ানোর এক মনোরম জায়গা জয়দেবপুর। মনভোলানো এই জায়গা দেখে বারবার প্রেমে মজে যাবেন কৃত্রিম হৃদের, ভাওয়াল রাজার বাড়ির, কালীমন্দিরের আল শাল-গজারির বনের। শ্মশানঘাটের পশে দাঁড়িয়ে দূরের বনাঞ্চলকে দেখে পাখির ডাকে আরো মোহিত হয়ে পড়বেন।
পরিবহনের খোঁজখবর : ঢাকা হতে জয়দেবপুর যাওয়ার জন্য সরাসরি পরিবহন রয়েছে। যেমনÑ গাজীপুর পরিবহন, ঢাকা পরিবহন।
হোটেলের খোঁজখবর : রাত্রি যাপন করার জন্য গাজীপুরে রয়েছে কয়েকটি হোটেল। এলিজা ইন্টারন্যাশনাল আবাসিক হোটেল উঠতে পারেন। ঠিকানা : পৌর সুপার মার্কেট, চতুর্থ তলা, জয়দেবপুর মধ্যবাজার, গাজীপুর সদর, গাজীপুর। মডার্ণ আবাসিক হোটেলে উঠতে পারেন। ঠিকানা : ভাওয়াল কমপ্লেক্স ২য় ও ৩য় তলা, থানা রোড, জয়দেবপুর বাজার, গাজীপুর।
রাজেন্দ্রপুর : রাজেন্দ্রপুর ও শালনা পাশাপাশি। এখানে গেলে বিশাল বন দেখতে পাবেন। পিকনিক করতে গেলে দলবেঁধে বনের আশপাশে ঘুরে বনের রহস্য উপভোগ করতে পারেন। এখোনের পার্কে দোলনায় চড়া যাবে।
বিভিন্ন তথ্য : মুহম্মদ শাহ তুঘলকের সময় পালোয়ান গাজী এই অঞ্চলে এসে বসতি স্থাপন করেন। পর্যায়ক্রমে গাজীবংমের লোকেরা ৫শত বছরের বেশি সময় এ এলাকা শাসন করেন। জনগণ তাদের শাসনামলের ইতিহাস, ঐতিহ্যকে ভালোবেসে এলাকার নাম রাখেন গাজীপুর। গাজীপুর জেলার উত্তরে টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহ জেলা, দক্ষিণে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ জেলা, পূর্বে নরসিংদী জেলা অবস্থিত। আয়তন প্রায় ১৭৪১ বর্গকিলোমিটার। গাজীপুর জেলার মোট উপজেলা ৭টি। এগুলো হলোÑ গাজীপুর সদর, শ্রীপুর, কালিয়াকৈর, কালীগঞ্জ, কাপাসিয়া, টঙ্গী ও জয়দেবপুর। এই জেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে তুরাগ, বালু, বানার, শীতলক্ষ্যা, লাখিয়া নদী।
ভাওয়ালগড়ের সেই কাহিনী : ঐতিহাসিক ভাওয়ালগড়ের কাহিনী আজ আর কারো অজানা নেই। কুমার রমেন্দ্রনারায়ণ, রানী লীলাবতী, আশু ডাক্তার অনেক আগেই মারা গেছেন। শুধু কালের সাক্ষী হয়ে রাজপ্রাসাদ, দীঘি ও মন্দিরগুলো দাঁড়িয়ে আছে। পনেরো বছর বয়সে লীলাবতীর বিয়ে হয়। তার বাবা ছিলেন রক্ষণশীল ব্রাহ্মণ। বিয়ের পরে স্বামীর ঘরে ওঠেন লীলাবতী। প্রায়ই তিনি দীঘির ঘাটে যেতেন। ঘাটের কিছু দূরেই বিশাল শালবনের সবুজ মায়াময় পরিবেশ। তার মাঝে রাঙামাটির রাস্তা। এসব লীলাবতীর মন কেড়ে নিত। রাজার নাটমন্দির খুব ঘাটা করে পূজা হতো। রানী বিলাসমণি নিজে মেয়েদের তত্ত্বতালাশ করতেন। ‘চতর’ গ্রামে থাকতেন লীলাবতী। ওই গ্রাম হতে ভাওয়াল রাজপ্রাসাদ খুব বেশি দূরে বেশি ছিল না। লীলাবতীর স্বামী রাজার সেরেস্তায়ই কাজ করতেন। কুমার রমেন্দ্রনারায়ণের প্রমোদকুঞ্জ থেকে নাকি লীলাবতী রেহাই পায়নি। পরে নিজের অপবিত্র দেহটা স্বামীর কাছ থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছিলেন। লীলাবতী আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলেন, পরে অবশ্য করেননি।
শ্রীপুর : রাজা শ্রীপালের নামানুসারে শ্রীপুর নামকরণ হয়েছে। এখানে দেখবেন কনুর দুর্গ ও দীঘি। মধুপুর গড় অঞ্চল রয়েছে এখানে। বনাঞ্চলও দেখবেন। শাহ সাহেবের মসজিদ, সাত খামার দরগা, কেওয়া আকন্দবাড়ি মসজিদ ঘুরে দেখেন। এখানে মাওনা, বর্মি, রাজবাড়ী, কাওরাইদ হাট ঘুরে দেখতে পারেন।

প্রিন্ট করুন

বিভাগ: ইতিহাস