নির্বাচিত খবর

জিরো থেকে হিরো ‘জনতার কমিশনার’ রাজীব

বিডি সংবাদ টোয়েন্টিফোর ডটকম: ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর যুবলীগ নেতা তারেকুজ্জামান রাজীবকে সন্ত্রাসবাদ, দখলদারিত্ব এবং চাঁদাবাজির অভিযোগে গ্রেফতার করেছে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটিলিয়ান (র‍্যাব)। বর্তমানে তার সম্পদের পরিমাণ শত কোটি টাকার পরিমাণ। নিজেকে ‘জনতার কমিশনার’ পরিচয় দেয়া রাজীবের বিরুদ্ধে জমি দখলের অভিযোগ উঠে একের পর এক। একইসঙ্গে বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তিনি সব সময় গাড়ির বহর নিয়ে চলাচল করতেন। নিজে চড়তেন বিলাসবহুল গাড়িতে। যার মধ্যে রয়েছে- মার্সিডিজ, বিএমডব্লিউ, ক্রাউন প্রাডো, ল্যান্ডক্রুজার ভি-৮ ও বিএমডব্লিউ স্পোর্টস কারও।

গতকাল শনিবার (১৯ অক্টোবর) রাত ১১টার দিকে রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়। রাতেই র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক সারওয়ার-বিন-কাশেম ব্রেকিংনিউজকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এরপর রাজীবের শিয়া মসজিদ সংলগ্ন মোহাম্মদীয়া হাইজিং সোসাইটির বাসায় ও কার্যালয়ে অভিযান চালায় র‍্যাব।

মোহাম্মদপুরের মোহাম্মদীয়া হাউজিং সোসাইটির এক কক্ষে ৬ হাজার টাকায় ভাড়া বাসায় থাকা রাজীবের বর্তমান ঠিকানা এখন ডুপ্লেক্স বাড়িতে। মোহাম্মদীয়া হাউজিং সোসাইটির ১ নম্বর সড়কের ৩৩ নম্বর প্লটে রাজীবের সেই বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাড়িটি। অথচ তার ‘দৃশ্যমান’ কোনও আয় নেই, কোনও ব্যবসা নেই। শোনা যায়, মালয়েশিয়ায় ‘সেকেন্ড হোম’ ও ‘দুবাই’তেও তার বড় ধরনের বিনিয়োগ রয়েছে।

জানা গেছে, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও মোহাম্মাদপুরের সাবেক সংসদ সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানকের ‘কথিত’ ছেলে রাজীব। রাজধানীর মোহাম্মদপুরে রাজত্ব গড়ে তুলেছেন তিনি। এলাকায় নিয়ন্ত্রণ করেন চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসবাদ ও দখলদারিত্ব। বাসস্ট্যান্ড, সিএনজি স্ট্যান্ড, ফুটপাতই তার চাঁদাবাজির মূল উৎস।

স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, রাজীবের ডানহাত শাহ আলম চৌধুরী জীবন একসময় মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডের সুপার মার্কেটের সোয়েটার কারখানার কর্মচারী ছিলেন। যুবলীগে যোগ দিয়ে বনে যান ‘জনতার নেতা’। রাজীবের হয়ে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কার্যকলাপ ও জমি দখলে লিপ্ত হন রাজীব।

কাটাসুর এলাকায় শাহ আলমের কার্যালয়। যে জমিতে তিনি আলিশান কার্যালয় গড়েছেন, তা কোনও সরকারি বা ব্যক্তিগত জমি নয়। অন্যের জমি দখল করে সেখানে কার্যালয় গড়েছেন এই যুবলীগ নেতা- এমন অভিযোগ আছে স্থানীয় পর্যায়ে।

এছাড়াও বেড়িবাঁধে ইজিবাইক থেকে নিয়মিত চাঁদা তোলা হয় রাজীবের সহযোগী ‘সিএনজি কামালের’ নির্দেশে। বছিলা যাওয়ার সড়কের সামনে থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশার স্ট্যান্ড হানিফ কোম্পানির বাড়ির সামনে সরিয়ে আনা হয়েছে কাউন্সিলর রাজীবের নির্দেশে। আর এসব অটোরিকশা থেকে প্রতিদিন তোলা হয় বিপুল অংকের চাঁদা। চাঁদা আদায় হয় বেড়িবাঁধ সড়কে চলাচলকারী লেগুনা, বাস থেকেও।

বছিলা নতুন রাস্তার ভ্রাম্যমাণ দোকানগুলোর হর্তাকর্তাও কামাল। দোকানপ্রতি এককালীন এক থেকে তিন হাজার টাকা নিয়ে সড়ক দখল করে হকার বসিয়েছেন কামাল। প্রতি দোকান থেকে প্রতিদিন আদায় হয় এক থেকে দেড় শ টাকা হারে। এখানে দোকান রয়েছে পাঁচ শতাধিক।

২০১৫ সালে কাউন্সিলর নির্বাচনে রাজীব ছিলেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী। দলীয় প্রার্থী ও মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সিনিয়র-সহ সভাপতি শেখ বজলুর রহমানকে হারিয়ে নির্বাচিত হন তিনি।

মোহাম্মদপুর এলাকায় যুবলীগের রাজনীতি দিয়েই রাজীবের রাজনৈতিক জীবন শুরু। অল্পদিনেই নেতাদের সান্নিধ্যে মোহাম্মদপুর থানা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক পদ বাগিয়ে নেন। অভিযোগ আছে, কেন্দ্রীয় যুবলীগের এক নেতাকে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা দিয়ে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবলীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক হন রাজীব।

সিটি করপোরেশন থেকে কাউন্সিলর হিসেবে মাসে ৩৬ হাজার টাকা সম্মানী ছাড়া আর কোনও দৃশ্যমাণ আয় নেই এই ওয়ার্ড কাউন্সিলরের। কমিশনার হওয়ার পরপরই তিনি স্বগঠিত বাহিনী দিয়ে রাজীব থেকে ক্রমশ হয়ে উঠেন স্বঘোষিত ‘জনতার কমিশনার’।

প্রিন্ট করুন

বিভাগ: রাজধানী