জীবন যুদ্ধে হার মানেনি বাঘার হাজেরা

সেলিম ভান্ডারী, বাঘা : জীবন যুদ্ধের লড়ায়ে হার মানেনি রাজশাহীর বাঘা উপজেলার দক্ষিন মিলিক বাঘা গ্রামের মৃত আশরাফুল মিস্ত্রির স্ত্রী বিধবা হাজেরা বেগম। স্বামীর বিদায়ের পর দীর্ঘ ১০ বছর এক হাতে ধরে রেখেছেন সংসারের হাল। ছেলে মেয়েকে লিখাপড়া করানোর পাশা-পাশি একজন দক্ষ নারী শ্রমিক হিসেবে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছেন হাজেরা বেগম। সে একাই নিজ হাতে তৈরি করেন দালান ঘরে লাগানো ভেন্টিলেটর, লইচি বা রেলিং, সীমানা নির্ধারণ পিলারও আলোক চুলা। যা বিক্রি করে চলে তার সংসার এবং ছেলে মেয়েদের লিখাপড়া।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ১০ বছর আগে ২০০৮ ইং সালের ১৩ মার্চ রড মিস্ত্রীর কাজ করতে গিয়ে ছাদ থেকে পড়ে সংসারের মায়া ছেড়ে না ফেরা দেশে চলে যান হেিজরা বেগমের স্বামী আশরাফুল ইসলাম। রেখে যান ৮ বছরের এক কন্যা ও ৬ বছরের এক পুত্র সন্তানসহ স্ত্রী হাজেরা বেগমকে। দুই সন্তান বুকে নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন হাজেরা বেগম। কে মানুষ করবে এই অবুঝ শিশুদের। কেই বা দিবে তিনবেলা এক মুঠু ভাত। কেই বা ধরবে তিন সদস্যের এই পরিবারে হাল।
অবুঝ শিশুদের মুখের দিকে চেয়ে কোন কুল কিনারা না পেয়ে নিজেই নেমে পড়েন কর্মের সন্ধানে। নারী শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন বাড়ির পাশে থাকা স্যানিটারি ল্যাট্রিনের রিং স্ল্যাব (পাট) তৈরীর কারখানায়। সেখান থেকে যে পরিমান আয় করতেন তাতে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হতো হাজেরা বেগমকে। একটু বেশি টাকা রোজগারের জন্য চলে যান রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার সারদা এলাকার অন্য একটি কারখানায়। সেখানে বছর খানের কাজ করার পর শিখে নেন কয়েক প্রকার হাতের কাজ। এর মধ্যেই কোন রকম সংসার চালিয়ে জমা করেছিলেন কয়েক হাজার টাকা। ওই টাকা দিয়ে ক্রয় করেন দালান ঘরে লাগানো ভেন্টিলেটর, লইচি বা রেলিং, সীমানা নির্ধারণ পিলার তৈরীর ফর্মা। ওইসব ফর্মা, সিমেন্ট, বালু আর রড কিনে একাই শুরু করেন দালান ঘরে লাগানো ভেন্টিলেটর, লইচি বা রেলিং, জমির সীমানা নির্ধারণ পিলার ও রান্নার জন্য আলোক চুলা তৈরীর কাজ। বাঘা উপজেলার দক্ষিন মিলিক বাঘা গ্রামের নিজ বাড়িতে এসব কাজ করতে থাকেন। অত্র এলাকায় তার দক্ষতা ও কাজের গুনগত মানে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছে ।
নারী শ্রমিক হাজেরা বেগম জানান, জীবন যুদ্ধে জয়লাভ করতে প্রথম পর্যায়ে নিজের তৈরী ভেন্টিলেটর, লইচি, সীমানা পিলার ও আলোক চুলা উপজেলার বিভিন্ন বাজারের হার্ডওয়ারের দোকানে দোকানে গিয়ে বিক্রি করতেন। ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে উঠেন নিজ উপজেলা বাঘাসহ পার্শ্ববর্তী চারঘাট উপজেলাতেও। এখন আর দোকানে দোকানে গিয়ে বিক্রি করা লাগেনা। বর্তমানে তার বাড়ি থেকেই ক্রয় করে নিয়ে যান ব্যবসায়ীরা। এতে বছরের ছয় মাস ডাল ভাত খেয়ে ভালোই চলে। এরপর ভোগান্তি পোহাতে হয় শীতের পাঁচ মাস ও পবিত্র রমাজান মাসে। বারোমাস উৎপাদনে ঘাটতি না থাকলেও শীত ওরমজান মাসে পাওয়া যায়না বিক্রয়ের কোন জায়গা। ফলে চরম দুর্ভোগ পোহতে হয় এই ছয় মাসে। ছেলে মেয়ের লিখাপড়া ও সংসার চালাতে বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋন নিতে হয় বলে জান হাজেরা। অভাবের সংসারের মধ্যে মেয়ে আফসানা মিমি আশাকে এইচএসসি পাশ করিয়ে বিয়ে দিয়েছেন। আর ছোট ছেলে মোতালেব হোসেন হিমেল ১০ম শ্রেনীতে অধ্যায়নরত। খেয়ে না খেয়ে একমাত্র ছেলেকে লিখাপড়া শিখিয়ে অনেক বড় অফিসার বানানোর স্বপ্ন নিয়ে ছেলের পড়াশুনা চালিয়ে যাচ্ছেন।
তিনি আরো জানান, তার তৈরী সকল সামগ্রীর ব্যাপক সুনাম থাকলেও সীমানা পিলার ও আলোক চুলার চেয়ে ভেন্টিলেটর, লইচি বেশি বিক্রি হয়। ভেন্টিলেটর ও লইচি দালান ঘর নির্মান কাজে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। শীতের পাঁচ মাস ও রমজান মাসে দালান ঘর নির্মান কম হওয়ায় বিক্রিও কমে যায়। ফলে সংসারে বেড়ে যায় অভাব-অনাটন। যদি বাঁকি ছয় মাসেও একই ভাবে বিক্রির কোন সুযোগ থাকতো তাহলে এতো চাপের মাঝে ঋনের বোঝা টনা লাগতো না।
ইমারত নির্মান শ্রমিক ইউনিয়ন বাংলাদেশ (ইনসাব) বাঘা পৌর কমিটির সভাপতি নাসিরুল ইসলাম বলেন, হাজেরা বেগম একজন গৃহিনী হিসাবে যেমন সংসারের হাল ধরে রেখেছেন, ঠিক তেমনি একজন দক্ষ নারী শ্রমিক হিসাবেও ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেছেন। হাজেরা বেগমকে আমাদের ইমারত নির্মান শ্রমিক ইউনিয়ন বাংলাদেশ (ইনসাব) এর বাঘা পৌরসভা কমিটির মহিলা সম্পাদিকার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তার নিজ হাতে তৈরী ভেন্টিলেটর ও লইচি বাঘা উপজেলা ছাড়াও পাশ্ববর্তী উপজেলাতেও ব্যবহার করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।#

প্রিন্ট করুন

বিভাগ: রাজশাহী,সারাদেশ