শিরোনাম

পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাস

ইতিহাস : ব্যাপকতর অর্থে পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসকে কোনওভাবেই ভারতের মতো সার্বভৌম, গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের অন্তর্গত একটি ছোট অঙ্গরাজ্যের ইতিহাস বলা যায় না। এটি বিশ্ব ইতিহাসের একটি উল্লেখনীয় অংশ।

প্রাচিন যুগে এই অঞ্চলটিকে (বর্তমান বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ)- বলা হত গঙ্গারিদৈ। গ্রীক পর্যটক মেগাস্থিনিসের ইন্ডিকা গ্রন্থে এই গঙ্গারিদৈ রাজত্বের বিবরন পাওয়া যায়। গঙ্গারিদৈ শব্দের অর্থ গঙ্গার সম্পদ। সংস্কৃত ভাষায় একে বলা হয় গঙ্গারাষ্ট্র যার অর্থ হল গঙ্গার তীরবর্তী অঞ্চল। খ্রীষ্টীয় ৪র্থ শতকে এই রাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

কোনও কোনও গ্রীক ও লাতিন ঐতিহাসিকের মতে গঙ্গারিদৈ ও প্রাচী অর্থাৎ প্রাচ্য (নন্দ) সাম্রাজ্যের প্রবল যৌথ প্রতিরোধের আশঙ্কায় মহামতি আলেকজান্ডার ভারত থেকে তাঁর সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন।

অনেক ঐতিহাসিকের মতে ওডিশার গঙ্গা সাম্রাজ্য ও কর্ণাটকের গঙ্গা সাম্রাজ্য উভয়ই গঙ্গারিদৈ জনোগোষ্ঠীর বংশোদ্ভত যারা দক্ষিণবঙ্গের তমলুক (মেদিনীপুর) থেকে দক্ষিণ ভারতে অভিবাসিত হয়েছিলেন। গঙ্গা নগরীর অবস্থান সঠিকভাবে চিহ্নিত করা যায়নি। দেগঙ্গার চন্দ্রকেতুগড়ে খননকার্যের ফলে পাওয়া প্রমাণাদি থেকে এই অঞ্চল গঙ্গা নগরীর জোরালো দাবিদার হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। সম্ভবত গঙ্গা নগরী ছিল চন্দ্রকেতুগড়ের বন্দর শহর।

প্রাক- ঐতিহাসিক বাংলা

gallery history

এই রাজ্যে খননকার্যের ফলে ২০০০০ বছরের প্রাচীন প্রস্তর যুগের যন্ত্রপাতির সন্ধান পাওয়া গেছে। এই অঞ্চলে ৪০০০ বছরের প্রাচীন তাম্রযুগের ধ্বংসাবশেষও আবিষ্কৃত হয়েছে। এই অঞ্চলের আদি অধিবাসীরা অনার্য ভাষায় বাক্যালাপ করতেন। খ্রিষ্টীয় ৭ম শতাব্দীতে মগধ সাম্রাজ্যের অঙ্গিভুতঝ বাংলা ইন্দো- আর্থ সভ্যতার অন্তর্ভুক্ত হয়।নন্দ বংশ প্রথম ঐতিহাসিক সাম্রাজ্য যা বাংলার সমস্ত অংশকে ইন্দো- আর্থ সভ্যতার অধীনে নিয়ে আসে।

মধ্য যুগের প্রথমাবস্থা

gallery history

সমুদ্রগুপ্তের বিজয়ের আগে অর্থাৎ গুপ্ত- পূর্ব যুগে বাংলা দুটি রাজ্যে বিভক্ত ছিল – পুষ্করনা ও সমতট। বঙ্গ রাজাদের একটি জোট দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের কাছে পরাজয় স্বীকার করে এবং এইভাবে বাংলা ক্রমে গুপ্ত সাম্রাজ্যের অঙ্গীভূত হতে থাকে। গুপ্ত শাসনে বাংলার অর্থনীতি বিশ্ববাণিজ্য ব্যবস্থার একটি অংশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে থাকে। ৬ ষ্ট শতাব্দীতে বঙ্গ, সমতট ও হরিকেলা রাজত্বের মধ্যে ভাগ হয়ে যায় যখন সমগ্র উত্তর ভারতে গুপ্ত বংশের প্রাধান্য লীন হয়ে আসছে। কর্ণসুবর্ণ (বর্তমানে মুর্শিদাবাদের কাছে একটি স্থান) কে রাজধানী করে গৌড় রাজারা শক্তি সঞ্চয় করে। গুপ্ত সম্রাটের সামন্ত শশাঙ্ক বাংলার ছোট ছোট রাজন্যবর্গকে একত্রিত করে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। শশাঙ্কের শাসনের পরবর্তী পর্যায়ে বাংলায় চরম অশান্তির প্রাদুর্ভাব ঘটে। একেই মাৎস্যন্যায় বলে। এরপর গোপাল (৭৫০-৭৭০)কে বাংলার মানুষ রাজা নির্বাচিত করে।

পাল বংশ (৭৫০- ১১২০) বাংলার প্রথম স্বাধীন বৌদ্ধ রাজবংশ। তাদেরই হাত ধরে বাংলা স্থায়িত্ব ও উন্নতির পথে ফেরে। পালেদের শাসনকালই বাংলার স্বর্ণযুগ। তারাই তিব্বত-ভুটান ও বার্মাদেশে মহাযান বৌদ্ধধর্মের প্রচলন করেন। তৎকালীন যুগে বাংলাই বৌদ্ধধর্মের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হতো। নালন্দা, বিক্রমশীলা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সোমপুর মহাবিহার স্থাপন পালেদের কীর্তি। বাংলার অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর হলেও দক্ষিণ- পূর্ব এশিয়ায় পাল রাজাদের ব্যবসা- বাণিজ্য প্রসারিত হয়েছিল। দক্ষিণের চোলা আক্রমণে পাল রাজত্ব বিধ্বস্ত হয়ে যায়। ১০২১ ও ১০২৩ খ্রিষ্টাব্দের মাঝামাঝি প্রথম রাজেন্দ্র চোলা বাংলায় সামরিক অভিযান চালান। চালুক্যরাজ প্রথম সোমেশ্বর-এর আমলেও তাঁর পুত্র ৬ ষ্ঠ বিক্রামাদিত্যের নেতৃত্বে দক্ষিণ দিক থেকে আক্রমন সংগঠিত হয় ও সেই আক্রমনে গৌড় ও কামরূপ – রাজ পরাস্ত হন। চালুক্যরাজ কর্ণাটক থেকে কিছু লোক বাংলায় এনেছিলেন। কোনও কোনও ঐতিহাসিকের মতে এর ফলে পরবর্তীকালের সেন বংশের দক্ষিনী উৎস সম্পর্কে কিছু অনুমান করতে পারি। তারা বিক্রমপুর (অধুনা মুন্সিগঞ্জ)-এ তাঁদের রাজধানী স্থাপন করে। সামরিক দিক দিয়ে অত্যন্ত শক্তিশালী হওয়ায় তারা সহজেই পাল রাজাদের উত্তর-পশ্চিমের দিকে পাঠিয়ে দিতে সমর্থ হন।

সেইযুগে পূর্ববঙ্গ (সুপ্রাচীন হরিকেলা, ভঙ্গ ও সমতট অঞ্চল নিয়ে গঠিত)- এ হরিকেলা রাজত্বে চন্দ্র বংশের শাসন দশম শতাব্দীর শুরু থেকে প্রায় দেড় শতাব্দী যাবৎ জারি ছিল। চন্দ্র বংশের শেষ রাজা গোবিন্দচন্দ্রকে প্রথম রাজেন্দ্র চোলা পরাজিত করেন।

সেন বংশ

gallery history

শেষ পাল সম্রাট মদনপালকে পরাজিত করে সেন বংশের দ্বিতীয় শাসক বিজয় সেন সাম্রাজ্য বিস্তার করেন। সেন বংশই দ্বাদশ শতাব্দীতে সমগ্র বাংলাকে এক শাসনের অধীনে নিয়ে আসে। এই বংশের তৃতীয় রাজা বল্লাল সেন নবদ্বীপে তাঁর রাজধানী স্থাপন করেন। ঐ বংশের চতুর্থ রাজা লক্ষণ সেন বাংলার বাইরে বিহার, আসাম, ওডিশা ও সম্ভবত বারানসী পর্যন্ত সাম্রাজ্য বিস্তার করেন। হিন্দু ধর্মকে পুনরুজ্জীবিত করে সংস্কৃত সাহিত্যের চর্চাকে জনপ্ত্রিয় করে সেন বংশ বাংলায় একটি গৌরবময় অধ্যায়ের সুচনা করেন।

মুসলমান শাসক বক্তিয়ার খিলজির আক্রমনে লক্ষণ সেন পরাজিত হন ও তিনি পুর্ববঙ্গে আশ্রয় নেন। পরবর্তীকালে সেখানে তিনি তাঁর শাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন।

মধ্যযুগের বাংলা

দ্বাদশ শতাব্দীতে সুফি সন্তরা বাংলায় পৌঁছন। এইভাবেই এখানে ইসলাম ধর্মের আগমন ঘটে। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে দিল্লী সুলতানির এক সামরিক শাসক বিহার, বাংলা থেকে শুরু করে পূর্বে রংপুর, বোগরা ও ব্রহ্মপুত্র নদ পর্যন্ত তার অভিযান চালান। বাংলাকে তিনি তার বশবর্তী করতে পারেন নি। তার দুই ছেলে বিক্রমপুরে আসেন। সেখানে ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত তাদের ক্ষয়িষ্ণু রাজ্যপাট টিকে ছিল। চতুর্দশ শতাব্দী থেকে পূর্বোল্লিখিত রাজ্য বিভিন্ন পর্যায়ে দিল্লীর সুলতানি- জমিদার- বারো ভুইঞাদের সঙ্গে বাংলার সুলতানি নামে অভিহিত হতে থাকে।

দেব বংশ

সেনা বংশের পতনের পর পূর্ববঙ্গে দেব নামে একটি হিন্দু রাজবংশ আধিপত্য বিস্তার করে। তাদেরও রাজধানী হয় বিক্রমপুর। বর্তমানের কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম পর্যন্ত এই রাজত্ব বিস্তারলাভ করেছিল। এই বংশের রাজা দনুজ মাধব দশরথ দেব পূর্ববঙ্গের বেশ বড় একটি অঞ্চলের ওপর তার আধিপত্য বিস্তার করেন।

বাংলার সুলতানি আমল
gallery historyসংক্ষিপ্ত ইতিহাস

১২০৪ থেকে ১২২৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলায় খিলজি বংশ রাজত্ব করেছিল। ১২২৭ থেকে ১২৮১ পর্যন্ত দিল্লীতে মামলুক সুলতানির অধীনে ১৫ জন প্রদেশ শাসক প্রশাসনের ভার নেয়। এরপর ১৩২৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বলবন শাসন চলে। কিছু বছর পর তারা স্বাধীন ভাবে বাংলাকে শাসন করতে থাকে। তুঘলক বংশের শাসনকালে ১৩২৪ থেকে ১৩৩৯ পর্যন্ত তিনজন প্রাদেশিক শাসনকর্তা সোনারগাঁও, সাতগাঁও এবং লখনভাটিতে শাষক নিযুক্ত হয়েছিলেন। পরে এদের মধ্যে ইলিয়াস শাহ এই সমস্ত অঞ্চলে তার আধিপত্য বিস্তার করেন এবং অঞ্চলগুলি ইলিয়াস শাহী বংশের স্বাধীন শাসনের অধিনস্ত হয়। ১৪৮৭ পর্যন্ত ইলিয়াস শাহী বংশ বাংলায় রাজত্ব করে যদিও ১৪১৪ থেকে ১৪৩৫ পর্যন্ত হিন্দু রাজা গণেশ ও তার পুত্র যদু (জালালুদ্দিন)বারবার ধর্মান্তরিত হয়ে হিন্দু বা মুসলমান ধর্ম গ্রহন করে বাংলার শাসনভার নিজেদের হাতে রাখে। ১৪৯৪ তে হুসেন শাহ বাংলার মসনদে বসেন। তার আগে অবশ্য কিছুদিন হাবসী (আবিসিনীয়)দের অধীনে (১৪৬৭- ১৪৯৪) বাংলাকে থাকতে হয়।

এই সময় বাংলার রাজনৈতিক পটভূমি অশান্ত।হুসেন শাহ, যাকে বাংলার সুলতানদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বলে মনে করা হয়, জন্মেছিলেন আরবদেশে। সাংস্কৄতিক পুনরুজীবনের জন্য তার শাসনকাল বিখ্যাত। ১৫৩৮ পর্যন্ত হুসেন শাহের বংশধরেরা বাংলা শাসন করেন। এরপর ১৫৫৪ থেকে শের শাহ্‌ সুরী আমলে বাংলার শাসনভার সামলান প্রাদেশিক শাসনকর্তারা। মহম্মদ শাহ (১৫৫৪-১৫৬৪) এবং কারানি আমল অতিবাহিত হওয়ার পর মোগল সাম্রাজ্যের অধীনে সুবেদাররা বাংলা শাসন করতে থাকে।

১৫৭৪ এ মোগল সম্রাট আকবর বাংলা অধিকার করেন ও সুবেদার নিয়োগ করেন। আকবর (১৫৭৪-১৬০৬), জাহাঙ্গীর (১৬০৬-১৬২৮),শাহ্‌জাহান (১৬২৮-১৬৬০) ও ঔরঙ্গজেব (১৬৬০-১৭১২) এর আমলে মোট ২৯ জন সুবাদার বাংলা শাসন করেন।ঔরঙ্গজেব এর পর মুর্শিদকুলি খাঁ বাংলায় স্বাধীন নবাবির পত্তন করেন ১৭১৭ খ্রিষ্টাব্দে এবং পরবর্তী দশ বছর তিনি ঐ দায়িত্ব সামলেছেন।আলিবদ্দী খাঁ (১৭৪০-১৭৫৬) এর পর সিরাজ উদ্-দৌলা বাংলার মসনদে বসেন (১৭৫৭) এবং ঐ বছরেই পলাশীর যুদ্ধক্ষেত্রে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে তিনি পরাজিত হন। ১৭৫৭ থেকে ১৭৬৫ পর্যন্ত মীরজাফর ও মিরকাশিম এর নেতৄত্বে নবাবি শাসন চললেও এই সময়ের মধ্যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ধীরে ধীরে একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান থেকে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হচ্ছিল।

বক্সার যুদ্ধ (১৭৬৪) বাংলার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। এ যুদ্ধে বাংলার নবাব মিরকাশিম, অযোধ্যার নবাব সুজা উদ্-দৌলা এবং মোগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ্‌ আলাম একযোগে কোম্পানির বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন এবং পরাজয় বরণ করেন। এই যুদ্ধের ফলস্বরুপ বাংলা থেকে দিল্লী পর্যন্ত কোম্পানির  সবিশেষ আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

বাংলার হিন্দু রাজন্য বর্গ

gallery historyসংক্ষিপ্ত ইতিহাস

মোগল আমলে বাংলায় বেশ কিছু হিন্দু রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বাংলার আর্থিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নসাধনে এই হিন্দু রাজাদের অবদান ছিল অনস্বীকার্য। মহারাজা রুদ্রনারায়ান এর আমলে ভুরশুত রাজবংশের শাসনকালকে এদের মধ্যে সবচেয়ে পরাক্রমশালী আখ্যা দেওয়া যেতে পারে। অধুনা হাওড়া ও হুগলী পর্যন্ত ভুরশুত রাজত্ব বিস্তার লাভ করেছিল। বর্ধমান রাজত্ব ছিল জমিদারী এস্টেট। ১৬৫৭ থেকে ১৯৫৫ পর্যন্ত মোগল ও ব্রিটিশ শাসনাধীনে বর্ধমান রাজত্ব সপ্রভাব বিদ্যমান ছিল। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে উত্তরবঙ্গের কোচবিহার রাজত্ব বিকাশ লাভ করে। ব্রিটিশদের আগমন পর্যন্ত এই রাজবংশ টিকে ছিল। বাংলার বারো ভুঁইঞাদের মধ্যে সবচেয়ে ভাস্বর যশোরের হিন্দু কায়স্থ রাজা মহারাজা প্রতাপাদিত্য (১৫৬১-১৬১১) এর নাম। তিনি মোগল কতৃত্ব অস্বীকার করে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং বাংলায় একটি হিন্দু রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। নদিয়া, উত্তর ২৪ পরগণা, দক্ষিণ ২৪ পরগণা, খুলনা, বরিশাল, সুন্দরবন তার রাজত্বের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তার বাবা শ্রীহরি বাংলার কারানি সুলতানির একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা হয়েও ১৫৭৬ এ সুলতানির অধীনতাপাশ থেকে নিজেকে মুক্ত করেন, নিজেকে স্বাধীন ঘোষণা করেন ও মহারাজা উপাধি নেন। তিনি তার রাজ্যকে দুই ভাগে ভাগ করে দুই পুত্র প্রতাপাদিত্য ও বসন্ত রায় কে তার শাসনভার অর্পণ করেন। যশোরের যুবরাজ তার রাজত্ব ও প্রজাদের রক্ষাকল্পে পর্তুগীজ ও মগ জলদস্যুদের বীরুদ্ধে বহু যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। এই দেশপ্রেমিক হিন্দু রাজা মোগল সাম্রাজ্যবাদের বীরুদ্ধেও যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন। সেই ঐতিহাসিক যুদ্ধ বাংলার রাজা প্রতাপাদিত্যের নামকে বাংলার হিন্দু জনমানসে অবিস্মরনীয় করে রেখেছে।

আধুনিক বাংলা (ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি)

gallery historyসংক্ষিপ্ত ইতিহাস

দিল্লী সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে বাংলার সুবাদার ইব্রাহিম খাঁ (১৬১৭৭-১৬২৪) এর সময়ে বাংলা, বিহার ও ওড়িশায় বাণিজ্যের জন্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধি এখানে প্রথম আসেন। মোগল সম্রাট শাহজাহানের কাছ থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি একটি ফরমান (রাজ ডিক্রি) লাভকরে ১৬৩৪-এ। এই ফরমান বলে তাঁরা বাংলায় একটি কারখানা স্থাপনের অনুমতি পেয়েছিল। ১৬৮২ তে সম্রাট ঔরংজেব তার প্রশাসক শায়েস্তা খাঁ এর মাধ্যমে এই মর্মে একটি বিশেষ ফরমান জারি করেন যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি পাকাপাকিভাবে বাংলায় ব্যবসা করতে পারে। কোম্পানি তাদের হুগলীস্থিত কারখানায় ৩০০ বার তোপধ্বনির দ্বারা তাদের এই সাফ্যলকে উদযাপিত করেছিল। ক্রমে বাংলার বিনিয়োগ বাড়ল এবং মাদ্রাজ রেসিডেন্সি থেকে বাংলাকে আলাদা করা হল। বাংলার বাণিজ্যের কাজ তদারকির জন্য মিঃ হজ মুখ্য আধিকারিক নিযুক্ত হলেন।

১৬৯০-এ তিনটি গ্রাম- কলকাতা,গোবিন্দপুর ও সুতানুটি- ক্রয়ের মাধ্যমে কলকাতার পত্তন হল। ১৭০১-এ কলকাতায় ফোর্ট উইলিয়াম স্থাপিত হল। ১৭৫৭-তে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ–উদ্-দৌল্লা ফোর্ট উইলিয়াম আক্রমন করলেন। এই আক্রমণই ছিল পরাধীনতার প্রথম সোপান। বার্ষিক ২৬০০০০০ টাকা কর দেওয়ার শর্তে ১২ অগাস্ট ১৭৬৫ কোম্পানি বাংলা, বিহার ও ওড়িষার দেওয়ানি লাভ করে। বাংলার নবাবদের পাশাপাশি তারাও প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হয়ে এই বিদেশী বাণিজ্য কোম্পানি নবাব এবং রাজ্যকে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। রেজা খান ও সেতাব রায় কোম্পানি কর্তৃক নায়েবসুবা হিসাবে নিযুক্ত হন। বাংলার নবাব আর্থিক ক্ষমতা হারান। এটিকেই বলা হত দ্বৈত শাসন। এই ঘটনা বাংলা ও ভারতবর্ষের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামো বদলে দেয়। ১৭৭৯ সালে কোম্পানি দেওয়ানির দায়িত্বভার গ্রহন করে।এইভাবে দ্বৈত শাসনব্যবস্থার পরিসমাপ্তি ঘটে। (ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ‘দা রেগুলেটিং অ্যাক্ট ১৭৭৩’ পাশ হয়। এইভাবে একটি ঔপনিবেশিক কাঠামোর উদ্ভব হয়। বাংলা, বিহার ও ওড়িষার ৩৫ টি জেলার প্রত্যেকটির জন্যে একজন জেলাশাসক ও একজন রাজস্ব সংগ্রাহক নিয়োগ করা হয়। ওয়ারেন হেস্টিংস গর্ভনর থেকে গর্ভনর জেনারেল হন।

gallery history

ব্রিটিশদের সামাজিক ও সংস্কৃতির নীতিসমূহ এবং ইংরাজি শিক্ষার প্রসার বাংলার মানুষের মনে বিশেষত শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মনে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনয়ন করে। সমাজের বিভিন্ন অংশে একের পর এক ছোটোখাটো বিদ্রোহের ঘটনা ঘটে। ১৮৫৭ সালে প্রথম বড় আকারের সিপাহী বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। এটি শুরু হয়েছিল বাংলায়, প্রথমে বহরমপুরে ও অতঃপর ব্যারাকপুরে। মুঘল সম্রাট ২য় বাহাদুর শাহ্‌ ও এই বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেন। এই মহাবিদ্রোহের পরে কোম্পানির শাসনের পরিসমাপ্তি ঘটে এবং ব্রিটিশ সরকার ভারতবর্ষের শাসনভার নিজেদের হাতে তুলে নেয় এবং এই দায়িত্বে একজন ভাইসরয় নিযুক্ত করে যিনি হন প্রকৃতপক্ষে রানি ভিক্টোরিয়ার প্রতিনিধি।

 

gallery history

উনিশ শতকের বাংলায় এক সামাজিক সাংস্কৃতিক জাগরণের ঘটনা ঘটে। রাজা রামমোহন রায়, দ্বারকানাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, কেশবচন্দ্র সেন, রামকৃষ্ণ পরমহংস, স্বামী বিবেকানন্দ, সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম,গিরীশ ঘোষ, জগদীশচন্দ্র বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, সতেন্দ্রনাথ বসু, মেঘনাধ সাহা, সুরেন্দ্রনাথ ব্যার্নাজী, আনন্দমোহন বসু, শিবনাথ শাস্ত্রী, উমেশচন্দ্র বন্ধ্যোপাধ্যায় প্রমুখ প্রখ্যাত ব্যক্তিত্বরা নতুন ইতিহাস রচনা করেন। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের ঘোষণা বাংলা তথা ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে এক নতুন উদ্যম সংযোজন করে। সেই সময় বাংলাই ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের কেন্দ্রস্থল। ব্রিটিশ সরকার বাংলা ও বাঙ্গালীকে বিভক্ত করে তাকে দুর্বল করতে প্রয়াসী হয়। তারা সাম্প্রদায়িক বিভাজন তৈরিতে সচেষ্ট হন। মিলিত পূর্ববঙ্গ ও পশ্চিমবঙ্গের থেকে বিহার, ওড়িষা ও আসাম পৃথক হয়ে যায়। ১৯১১ সালে ভারতবর্ষের রাজধানী ক্যালকাটা (বর্তমানে কলকাতা) র থেকে দিল্লীতে স্থানান্তরিত হয় এবং কলকাতা হয় বাংলার রাজধানী। সেইসময় বাংলা ছিল একটি বড় রাজ্য। পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের ঘটনা ও এর বিরুদ্ধে আন্দোলন এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তখন এটি প্রতিরোধ করা গেলেও শেষপর্যন্ত ১৯৪৭ সালে এই বিভাজন কার্যকর হয়।

১৮৮৫ সালে জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলার রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ চরমপন্থি ও নরমপন্থি – এই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েন। অরবিন্দ ঘোষ, বিপিনচন্দ্র পাল, চিত্তরঞ্জন দাস, সুভাষচন্দ্র বোস সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির পক্ষপাতী ছিলেন। উগ্র জাতিয়তাবোধের জন্ম হয়। ১৯০২ সালে বাংলায় অনুশীলন সমিতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবের সূচনা হয়। তারপর ১৯০৬ সালে যুগান্তর দল প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯০৯ সালে এই সব দল গুলি নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। এগুলি ছাড়াও সাধনা সমিতি, সুহৃদ সমিতি, ব্রতী সমিতি, মুক্ত সংঘ, হিন্দুস্তান সোশালিস্ট রিপাবলিকান আ্যসোসিয়েশন, বেঙ্গল ভলেন্টিয়ারস প্রভৃতি সমিতিগুলি বৈপ্লবিক আদর্শবাদ প্রচারের কাজে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে।

gallery history

বাংলা ও ভারতবর্ষের সংগ্রাম আন্দোলনে বৈপ্লবিক উগ্রপন্থা এক চালিকাশক্তির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। যদিও ১৯০৯ সালে এই গুলি নিষিদ্ধ করা হয় কিন্তু ১৯৩০ সালে পুনরায় বাংলার বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডের দ্বিতীয় পর্যায়ের সূচনা হয়। সন্দেহ নেই ১৯৩০ সালে মাষ্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই ব্রিটিশ শাসনের ভিত নাড়িয়ে দেয়। বৈপ্লবিক চিন্তাভাবনা ও কর্মকাণ্ড ধীরে ধীরে বাংলা থেকে সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৪৭ সালে যখন ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভ করে তখন বাংলা দ্বিখণ্ডিত হয়। পশ্চিম অংশটি ভারতবর্ষের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং এই অংশের নাম হয় পশ্চিমবঙ্গ। পূর্ব অংশটি একটি প্রদেশ হিসাবে পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত হয়। এই প্রদেশটি ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ-এ পরিণত হয়।

প্রিন্ট করুন

বিভাগ: ইতিহাস