বগুড়ার সাংবাদিক দীপঙ্কর চত্রুবর্তী’র হত্যাকান্ডের ১ যুগ পূর্তি ॥ অধরাই রয়ে গেল হত্যাকারীরা

dipokonkerদীপক সরকার : আজ ২অক্টোবর । আজকের এ দিনেই আততায়ীর হাতে নির্মমভাবে খুন হন উত্তরাঞ্চলের প্রথিতযশা সাংবাদিক দীপঙ্কর চক্রবর্তী। সেই থেকে এ দিনটাকে দেশের সাংবাদিক সমাজ কালোদিবস হিসাবে পালন করে আসছেন। এ হত্যাকান্ডের বিচারের দাবি জানিয়ে সাংবাদিক সমাজ নানা কর্মসূচিও পালন  করে আসছে প্রতিবছর। সাংবাদিক সমাজের সেই দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে তৎকালিন ও বর্তমান মতাসীন দলের কর্ণধাররা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচ্চ পর্যায়ের কর্তারা একাধিকবার খুনিদের সনাক্তকরণ এবং গ্রেফতারের প্রতিশ্রুতি দেন। দেখতে দেখতে  ২০০৪ সাল থেকে দীর্ঘ ১২টি বছর  তথা ১ যুগ পেরিয়ে গেলেও সাংবাদিক দীপঙ্কর হত্যাকান্ডের রহস্য উম্মোচন করতে পারেনি সরকারের গোয়েন্দা সংস্থারা। চিহিৃত করতে পারেনি আজও প্রকৃত খুনিদের। অধরাই রয়ে গেল খুনিরা। কেবলমাত্র  সাংবাদিক দীপঙ্কর হত্যার মামলার নথিপত্র থানা পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ, আদালতের আদেশে থানা পুলিশ হয়ে দ্বিতীয়বারের মত আবারও মামলাটির তদন্তভার সিআইডির একজন এএসপির ওপর ন্যস্ত করা হয়েছিল। আর এভাবে তদন্তেই রয়ে গেল ১১টি বছরের সাংবাদিক দীপঙ্কর হত্যা মামলার নথিপত্র। তবে মামলাটি তদন্তকালে সন্দিহানভাবে ৭জনকে আসামি হিসাবে  গ্রেফতার করেছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা। কিন্তু আইনের ফাঁক ফোকড় দিয়ে তারাও মামলা থেকে রেহাই পায় এবং সেই থেকে এ মামলায় আর কোন কু- উদ্ধার হয়নি।
এদিকে চাঞ্চল্যকর এই মামলাটি গতানুগতিকভাবে অন্যান্য মামলার মত করে তদন্ত করায় সাংবাদিক দীপঙ্কর খুনের রহস্য এতদিনেও উদঘাটন রহস্যঘেরা আইনশৃংখলা বাহিনীর উপর হতাশা প্রকাশ করেন আওয়ামীলীগ ও বিএনপি নেতারা। তাঁরা বলেন, গুরুত্ব দিয়ে মামলাটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা তদন্ত করলে অনেক আগেই হয়তো খুনের রহস্য বেরিয়ে আসতো। প্রকৃত খুনিরাও ধরা পড়তো। এ প্রসঙ্গে শেরপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র, বগুড়া জেলা বিএনপির উপদেষ্টা জানে আলম খোকা বলেন, বিস্ময়ের ব্যাপার হলো তাঁর কোন শক্র ছিল না। তিনি ছিলেন একজন সাংস্কৃতিক মনা ব্যক্তিত্ব। কেন তাকে খুন করা হলো সচেতনমহল এখনও বুঝে  উঠতে পারেনি। এ হত্যাকান্ডের ঘটনায় থানায় মামলা হলেও এতদিনেও কোন কু বের করতে পারলনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা। তবে মামলাটি অত্যন্ত স্পর্শ কাতর হলেও পুলিশ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কাছে তা মনে হয়নি। এসব দপ্তরের উর্ধতন কর্মকর্তারা মামলাটি গুরুত্ব সহকারে দেখভাল করেনি। গতানুগতিক অন্যান্য মামলার মত এই মামলাটিও তদন্ত করা হয়েছে। যে কারণে আজও বিশিষ্ট সাংবাদিক দীপঙ্কর খুনের রহস্য উদঘাটন হয়নি বলে বিএনপি’র এই নেতা মনে করেন। এরপরও তিনি আশাবাদি, হয়তো আগামি দিনে দীপঙ্কর খুনের রহস্য  গোয়েন্দা কর্মকর্তারা উদঘাটন করতে পারবেন। অপরদিকে শেরপুর  পৌর মেয়র ও উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি আলহাজ্ব মোঃ আব্দুস সাত্তার বলেন, হত্যাকান্ডের পর মুর্হুতের সময়গুলো মামলাটি সঠিকভাবে তদন্ত করা হয়নি। ওই সময় প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্তারা যদি গুরুত্ব দিয়ে মামলাটি তদন্ত করলে হয়তো খুনের রহস্য তখনই বেরিয়ে আসতো কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তা করেন নি বলে এই আওয়ামীলীগ নেতাও মন্তব্য করেন। তারপরও বর্তমান সময়ে মামলাটি গুরুত্ব সহকারে আইনশৃঙ্খলা দপ্তরের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সঠিকভাবে তদন্ত করলে সাংবাদিক দীপঙ্কর খুনের রহস্য অবশ্যই উম্মোচিত হবে বলে এই আওয়ামীলীগ  নেতা অভিমত ব্যক্ত করেন। তবে আওয়ামীলীগ-বিএনপি, জাতীয় পার্টি, সিপিবিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক, সামাজিক,সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাদের মন্তব্য সরকারের আইন শৃংখলা বাহিনীর ব্যর্থতার কারনেই সাংবাদিক দীপঙ্কর চক্রবর্তী, গৌতম দাস, হুমায়ন কবির বালু, সাগর-রুনীসহ অন্যান্য সাংবাদিক হত্যাকান্ডের খুনীরা আজো অজানাই রয়ে গেল।
উল্লেখ্য বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সহ সভাপতি ,বগুড়ার শেরপুর প্রেসকাবের সাবেক সভাপতি, বগুড়া থেকে প্রকাশিত দৈনিক দুর্জয় বাংলা পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক দীপঙ্কর চক্রবর্তী তাঁর কর্মস্থল বগুড়া থেকে বাড়ি ফেরার পথে ২০০৪ সালের ২ অক্টোবর গভীর রাতে শেরপুর পৌরশহরের স্যানালপাড়াস্থ বাসার সামনে বিদ্যুতের ল্যাম্প পোস্টের নিচে অজ্ঞাত আততায়ীর হাতে নির্মমভাবে খুন হন। নৃশংস ওই হত্যাকান্ড ঘটিয়ে ঘাতকরা নির্বিঘেœ পালিয়ে যায়। ঘটনার পরদিন তার বড় ছেলে পার্থ সারথী চক্রবর্তী কারো নাম উল্লেখ না করে শেরপুর থানায় একটি মামলা করেন। পরবর্তীতে হত্যাকান্ডের মাত্র ৩ মাসের মাথায় ২০০৫ সালের জানুয়ারিতে মামলাটি চাঞ্চল্যকর হিসাবে সিআইডিতে প্রেরণ করা হয়। মামলা চলাকালে প্রথমে পুলিশ ও পরবর্তীতে সিআইডি’র একাধিক কর্মকর্তা নিহতের পরিবারের সঙ্গে দেখা করেন। তারা ওই হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা হবে বলেও আশ্বাস দেন। পরে ওই মামলার ফাইলবন্দি হয় লাল ফিতায় এবং মামলাটির ফাইনাল দেন সংশ্লিষ্ট তদন্তকারি কর্তারা। এদিকে  বাদিপে মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবী এ্যাডভোকেট গোলাম ফারুক জানান মামলাটি কোন এলিট ফোর্সের চৌকশ কর্মকর্তাকে দিয়ে পুনঃতদন্তের জন্য আদালতে আবেদন জানানো হয়েছে। আদালত শুনানী শেষে তা মঞ্জুর করেন এবং সিআইডির এএসপির ওপর মামলাটির তদন্তভার ন্যস্ত করে ওই আদেশ দেন। আইনজীবি আরো বলেন, তৎকালীন সময়ে বগুড়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার কাজী মোরতাজ সাংবাদিক দীপঙ্কর হত্যাকান্ড ডিক্টেট বলে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে মন্তব্য করেছিলেন। এরপর তিনিও ওই সময় তাকে অন্যত্র বদলি করা হয়। অথচ এই মামলার ব্যাপারে ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে কখনও কোন তদন্ত কর্মকর্তা জিজ্ঞাসাবাদ করেননি বলেও বিষয়টি আদালতের সামনে তুলে ধরেছেন বলে তিনি জানান। এরপরে সিআইডি’র তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা ২০০৭ সালের নভেম্বর মাসে বগুড়া জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিলে বাদী আদালতে নারাজি আবেদন করেন। পরে বিজ্ঞ আদালত মামলাটি পুনঃতদন্তের জন্য শেরপুর থানায় প্রেরণ করেন। গত ২০১৪ সালে ৬ আগস্ট শেরপুর থানার তৎকালীন অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আমিরুল ইসলাম দ্বিতীয় দফা মামলাটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দিলে বাদী আবারও নারাজি আবেদন করেন। এরই প্রেেিত আদালত ওই বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর সিআইডির একজন সিনিয়র এএসপি পর্যায়ের কর্মকর্তা দিয়ে মামলাটি পুনঃতদন্তের নির্দেশ দেন। এতে সিআইডি’র সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) আব্দুস সামাদ মিঞা নবম তদন্ত কর্মকর্তা হিসাবে মামলাটির তদন্ত করেন এবং  তিনিও হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘাটনে ব্যর্থ হয়ে এবং তৃতীয় দফা আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। নিহত সাংবাদিকের  ছোট ছেলে অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী গোপা জানান, ইতিপূর্বে আদালতে পুনরায় নারাজি আবেদন করায় বিজ্ঞ আদালত মামলা গোয়েন্দা পুলিশ(ডিবি) কে পুনঃ তদন্তের নির্দেশ দেয়। এর প্রেক্ষিতে বগুড়া ডিবি পুলিশের অফিসার ইনচার্জ আমিরুল ইসলামের নেতৃত্বে একজন চৌকষ পুলিশ অফিসার মামলাটি তদন্ত করছেন বলে জানা গেছে। ডিবি ওই কর্মকতা আমিরুল ইসলাম বলেন, মামলাটি নিয়ে জোরালো তদন্ত করা হচ্ছে, খতিয়ে দেখা হচ্ছে কিভাবে ও কোন কারনে দীপঙ্কর সাংবাদিককে হত্যা হয়েছে ইত্যাদি কারণ। এ বিষয়ে বর্তমানের শেরপুর থানার অফিসার ইনচার্জ(ওসি) খান মোঃ এরফান বলেন, এ থানায় যোগদানের পর অবদি সাংবাদিক দীপঙ্কর চক্রবর্তী হত্যাকান্ডের কোন নথিপত্রও আমার কাছে আসেনি। তবে বিষয়টি ডিবি পুলিশ তদন্ত করছেন বলে তিনি জানান।
এ প্রসঙ্গে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার(বি সার্কেল) গাজিউর রহমান বলেন, সাংবাদিক দীপঙ্কর চক্রবর্তী হত্যাকান্ডের মামলা সংক্রান্ত বিষয় জেলা গোয়েন্দা পুলিশের তদন্তাধীন রয়েছে। এ মামলায় উল্লেখ যোগ্য কোন কু উদ্ধার হয়নি। তবে জোর প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে রহস্য উদঘাটনে।
অপরদিকে আজ ২ অক্টোবর সাংবাদিক দীপঙ্কর হত্যাকান্ডের ১ যুগপূর্তি  দিবসে বিচারের দাবিতে শেরপুর উপজেলা প্রেসকাবসহ অন্যান্য সংগঠনের উদ্যোগে বরাবরের মত এবারও সকাল সাড়ে ৯টায় কালো ব্যাচ ধারণ, বেলা ১০টায় স্থানীয় বাসষ্ট্যান্ডে মানববন্ধন, প্রতিবাদ সভা ও স্মরণসভা কর্মসূচি নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।

প্রিন্ট করুন

বিভাগ: অন্যান্য,মিডিয়া,রাজশাহী,সারাদেশ