মাধ্যমিক পড়েই তিনি এমবিবিএস ডাক্তার!

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট: পড়েছেন মাত্র মাধ্যমিক পর্যন্ত। এরপর একজন চিকিৎসকের সাহায্যকারী (কমপাউন্ডার) হিসেবে কিছুদিন কাজ করে পরে নিজেই চিকিৎসক বনে যান। নিজের নামের সামনে যোগ করেন এমবিবিএস এবং এফসিপিএস’র মতো বড় বড় ডিগ্রির পদবি। লোকজনের কাছে বিষয়টিকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে নিজের নামে ছাপান ভিজিটিং কার্ড।

রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগোযুক্ত প্যাডে প্রেসক্রিপশনও করতেন। লোকজনও তাকে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেই চিনতেন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে কয়েকটি জেলায় প্রতি সপ্তাহে রোগীও দেখতেন। রোগীকে দেখা শেষে তার হাতে ধরিয়ে দিতেন নিজের ভিজিটিং কার্ড। এভাবেই প্রায় চার বছর ধরে সাধারণ মানুষের সাথে প্রতারণা করে আসছিলেন ভুয়া চিকিৎসক আব্দুল হান্নান মিয়া ওরফে আবুল বাশার মিয়া (৪৮)।

সম্পতি রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকায় এমন প্রতারণার কাজটি করতে গিয়ে তিনি ধরা খেয়ে বসেন। হাতেনাতে পুলিশ তাকে আটক করে। এখন সেই ভুয়া চিকিৎসকের জায়গা হয়েছে কেরানিগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগারে। আটকের পর বেরিয়ে এসেছে তিনি কিভাবে একজন ভুয়া চিকিৎসক হয়ে উঠলেন আর কিভাবে প্রতারণার কাজটি চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

এই ভুয়া বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক লোকজনের চোখে ধুলা দিয়ে টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, নরসিংদীসহ বিভিন্ন জায়গায় সাপ্তাহিকভাবে রোগীও দেখেছেন। কিন্তু তিনি যে একজন ভুয়া চিকিৎসক সেটি এতোদিন কেউ আঁচও করতে পারেননি। তাকে কখনোই বুঝতে পারেননি তিনি একজন ভুয়া চিকিৎসক। গত ৯ নভেম্বর তাকে হাতেনাতে ধরা পড়তে হয়।

পু্লিশ জানায়, তাদের কাছে অভিযাগে আসে এক ব্যক্তি নিজেকে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কলসালটেন্ট দাবি করছেন। তিনি নিজেকে কলসালটেন্ট দাবি করে যাত্রাবাড়ী এলাকার একটি ফার্মেসীতে বসে রোগীও দেখে হাতিয়ে নিচ্ছেন হাজার হাজার টাকা। তবে সেই ভুয়া বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তার স্বপক্ষে কাউকে কানো প্রমাণ দেখাতে পারেননি। ভুক্তভোগী কয়েকজন রোগীর অভিভাবকের অভিযাগের প্রেক্ষিতে বিষয়টির তদন্তে নামে যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ। তদন্তের ভার দেয়া হয় এসআই সাইফুল ইসলামকে। তদন্তের আগে সাইফুল ইসলাম বিষয়টি নানাভাবে যাচাই-বাছাই করেন এবং শেষে মাঠে নামেন।

এসআই সাইফুল ইসলাম জানান, গত ৯ নভেম্বর সন্ধ্যায় তিনি যাত্রাবাড়ীর শনিরআখড়ার গোবিন্দপুর বাজার এলাকার আল মক্কা মার্কেটের আল আমিন মেডিকেল হলে যান। সেসময় সেই ভুয়া চিকিৎসক বিভিন্ন রোগী দেখছিলেন। পরে রোগী দেখা শেষ হলে তার সাথে পুলিশের এসআই সাইফুল কথা বলেন এবং আবুল বাশার যে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তার স্বপক্ষে প্রমাণ চান। এ কথা শোনার পর ভুয়া চিকিৎসক আবুল বাশার নানাভাবে তর্কবিতর্ক করতে শুরু করেন।

এক পর্যায়ে তিনি তার ডিগ্রির সাটিফিকেট দেখাতে রাজি হন। পুলিশ সদস্যরা প্রমাণস্বরূপ তার ব্যবহৃত ডিগ্রির কাগজপত্র চাইলে তিনি বলে উঠলেন, তার স্ত্রী অস্ট্রেলিয়ায় থাকেন এবং তিনি সেই উত্তরার বাসায় থাকেন। তার স্ত্রীর বাসায় সেই কাগজপত্র রাখা আছে। শুরু হয় তাকে নিয়ে তার সার্টিফিকেট উদ্ধারের কাজ। আবুল বাশারও নিজেকে আসল চিকিৎসক প্রমাণের লড়াইয়ে নেমে পড়েন।

তার কথা অনুযায়ী তাকে নিয়ে একটি সিএনজি ভাড়া করে যাত্রা শুরু হলো উত্তরা দিকে। পথে তিনি আবারও জানালেন তার নাকি মালিবাগে আরেকটি বাসা আছে কিন্তু সেখানে তিনি ঢুকলেন না। উত্তরায় পৌঁছার পর তার বাসায় না নিয়ে সিএনজি ঘোরাতে বলেন। তার ডিগ্রীর সার্টিফিকেট নাকি ধানমন্ডির বাসায় রাখা আছে। এবার গন্তব্য শুরু হলো ধানমন্ডির বাসার দিকে। সিএনজি ঘুরিয়ে নেয়া হলো। যথারীতি সিএনজি ছুটে চললো ধানমন্ডির বাসার ঠিকানা স্টার কাবাব এলাকার দিকে। সেখানে পৌঁছাতেই তিনি এবার জানালেন তার সার্টিফিকেট নাকি এখানেও রাখা হয়নি। মালিবাগের বাসায় রাখা হয়েছে। এবার পুলিশের সন্দেহ আরও বেড়ে গেল। পরে সিএনজিতে নিজের মুখে আবুল বাশার স্বীকার করলেন তিনি একজন ভুয়া চিকিৎসক।

এরপর পুলিশের এসআই সাইফুলকে উদ্দেশ্য করে ভুয়া চিকিৎসক বলেন, ‘স্যার আমাকে ছেড়ে দেন। যতো টাকা চান আমি আপনাকে খুশি করবো।’ পরে তাকে ধরে সোজা থানায় নিয়ে যান সেই পুলিশের এসআই।

ভুয়া চিকিৎসক আবুল বাশারের ভাষ্য, তিনি পরিবার নিয়ে থাকেন মিরপুরের রুপনগর থানার রুপনগর আবাসিক এলাকার ১৮ নম্বর রোডের ৪১ নম্বর বাসায়। সে বাসাতে তার স্ত্রী ও দুই সন্তান থাকেন। আর তিনি এভাবেই বিভিন্ন জায়গায় প্রতারণা করে যে আয় করতেন তাতে সংসার চালাতেন। তবে তিনি রুপনগরের বাসাতে স্থায়ীভাবে থাকেন না। তার গ্রামের বাড়ি কুড়িগ্রাম জেলার ভুরুঙ্গামারি উপজেলার বলদিয়া ইউনিয়নের কেদার গ্রামে। তার বাবার নাম মৃত আব্দুল কাদের মিয়া।

ভুয়া চিকিৎসক আবুল হান্নান নিজ মুখে তার দোষ স্বীকার করেছেন। তিনি প্রায় চার বছর ধরে এই প্রতারণার কাজটি করে আসছেন। রোগীদের কাছ থেকে পাঁচশত টাকা করে ভিজিট নিতেন। এ কাজে তাকে আরও দুই ব্যক্তি সহায়তা করেন। তার মধ্যে একজন তাকে সহায়তা করেন আরেকজন যখন যেই এলাকায় তিনি চিকিৎসক সেজে যান সেখানে তার আগে মাইকিং করে বিষয়টি সকলকে জানানোর কাজ করেন। পাশাপাশি তার প্রচারণার জন্য তিনি প্রত্যেক রোগীকে দেখার পর হাতে তার ভিজিটিং কার্ড ধরিয়ে দিতেন। যেখানে তার পরিচয় একজন এমবিবিএস এবং এফসিপিএস চিকিৎসক।

এসআই সাইফুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি তদন্তের ভার পাওয়ার আগে এই নামে কোনেও চিকিৎসক আছেন কিনা তা যাচাই করার জন্য বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে খোঁজ নিয়েছি। এজন্য আমাকে হাসপাতালটিতে স্বাধীণতার থেকে আজ অবধি যারা সেখানে চিকিৎসক হিসেবে কাজ করেছেন তাদের সবার নাম বের করতে হয়েছে। যেখানে যাচাই করে দেখা গেছে এই নামে কোনও চিকিৎসক নেই।

তিনি বলেন, বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর আমরা তার ডিসপেনসারিতে অভিযান চালিয়েছি। বিষয়টি খুব জটিল ছিল। তিনি যে একজন ভুয়া চিকিৎসক এটা প্রমাণ করা বেশ কঠিন ছিল। কিন্তু লেগে থাকার কারণে সেটি সম্ভব হয়েছে এবং তিনিও সেটি অকপটে স্বীকার করেছেন।

বিডি সংবাদ টোয়েন্টিফোর ডটকম/

প্রিন্ট করুন

বিভাগ: জাতীয়