রংপুর অঞ্চলে আমন চারার তীব্র সংকট: দিশেহারা কৃষক

রংপুর প্রতিনিধি: সাম্প্রতিক বন্যার পানিতে ডুবে আমনের বীজতলা পচে নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে আমন ধানের চারার তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে রংপুর অঞ্চলের কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা,রংপুর, লালমনিরহাট ও নীলফামারী জেলায়। চারার অভাবে আমন ধান চাষ করতে না পেরে দিশেহারা হয়ে পড়েছে কৃষকরা।

জানা গেছে, চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের শুরুতেই টানা ভারী বৃষ্টি এবং উজানের পাহাড়ি ঢলে তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, ঘাঘট, দুধকুমর, চিকলী, যমুনেশ্বরী, ধরলাসহ শতাধিক নদ-নদীর পানি ব্যাপক ভাবে বৃদ্ধি পায়। দুই দফা বন্যায় রংপুর অঞ্চলের শত শত হেক্টর জমির বীজতলা টানা প্রায় ১০ থেকে ১৫ দিন ডুবে থাকে। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধার জেলার আমনের বীজতলা। পানির নিচে থাকায় পচে নষ্ট হয় কৃষকের আমন বীজতলা। বন্যার পানি নেমে গেলে আমন ধান চাষে মাঠে নেমে পড়ে কৃষকরা। কিন্তু চারা গাছ নষ্ট হওয়ায় চারার সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে চাষিরা তুলনামূলক উঁচু অঞ্চলে ছুটছেন আমনের চারা সংগ্রহে।

এদিকে রংপুর অঞ্চলের কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধা জেলার প্রায় অধিকাংশ এলাকায় জলাবদ্ধতা ও বন্যায় বীজতলা নষ্ট হওয়ায় আমনের চারার দামও বেড়েছে কয়েক গুণ। আমন চারা অনেক কৃষকের নাগালের বাইরে রয়েছে। অপরদিকে ধানের বাজার দাম কম থাকায় বেশি বিনিয়োগ করতেও হিমশিম খাচ্ছেন কৃষক।

আদিতমারী উপজেলার বড় কমলবাড়ি গ্রামের শাহেদ আহমেদ ও শাওন নামের দুই কৃষক বলেন, ‘এবারের বন্যায় আমন চাষের বীজতলা নষ্ট হয়ে গেছে। আমন ধান লাগানোর মতো একটি চারা গাছও নেই। এখন চারা কিনে জমিতে আমনের চাষ করতে হবে। তবে চারার দাম বেশি হওয়াতে খুবই দুশ্চিন্তায় রয়েছি।’

অন্যদিকে আদিতমারী উপজেলার রজবপাড়া গ্রামের কৃষক আব্দুর রাজ্জাক হিরু জানান, ৮ দোন (২৭ শতাংশ) শতাংশ জমিতে আমন লাগাতে বীজতলা তৈরি করেন তিনি। চারা গাছ বেশ বড় ও হৃষ্টপুষ্ট হয়েছিল। কিন্তু বন্যার পানিতে টানা ১০ দিন ডুবে থাকায় সমূলে নষ্ট হয়েছে। ধানের দাম কম থাকায় চড়া দামে চারা গাছ কিনে রোপণ করে মুনাফা নিয়েও শঙ্কিত তিনি।

রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার পুর্ব ইছলী গ্রামের ইউনুস আলী ও মহিপুর এসকেএস বাজারের নুরুল মিয়া বলেন, ‘বীজতলার আমন চারা গাছ বন্যায় ডুবে নষ্ট হয়েছে। উঁচু অঞ্চল থেকে ধানের চারা গাছ কিনে লাগাবেন। এতে দোন প্রতি খরচ হবে ১২শত টাকা। এত খরচ করে ধান চাষে মুনাফা হবে না।’

অন্যদিকে কাউনিয়া উপজেলার বুড়িরহাট চরগনাই গ্রামের মমিনুল ইসলাম জানান, পরিবারের খাদ্যের যোগান দিতে মাত্র ৫৪ শতাংশ জমিতে আমন ধানের চাষ করবেন তিনি। যার অর্ধেক জমির চারা এখনো কিনতে পারেননি। চারা গাছ পেলে রোপণ করবেন। না পেলে জমি ফাঁকা ফেলে রাখবেন।

হাতীবান্ধা উপজেলার পারুলিয়া গ্রামের চাষি মনোয়ার হোসেন জানান, বন্যায় পানিবন্দিদের ত্রাণ দেয়া হয়। কিন্তু কৃষকের আমনের বীজতলা নষ্ট হলেও কেউ সহায়তা করে না। এ জন্য সরকারিভাবে চারা গাছ সরবরাহের দাবি জানান তিনি।

কুড়িগ্রামের চিলমারি আষ্টমীর চর গ্রামের আলম মিয়া বলেন, ‘সরকার বন্যার্তদের ত্রাণ দেয়। ত্রাণ হিসেবে কৃষকদের আমনের চারা গাছ দেয়া হোক। নতুবা চারা গাছের অভাবে এ অঞ্চলের অধিকাংশ জমি ফাঁকা থাকবে।’

রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, রংপুর অঞ্চলের কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর ও গাইবান্ধা জেলায় ৫ লক্ষ ৬ হাজার হেক্টর জমিতে চলতি মৌসুমে আমন ধান চাষের লক্ষমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩২ হাজার ১১৬ দশমিক ৯ হেক্টর জমির বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান জানান, রংপুর অঞ্চলে সৃষ্ট বন্যায় বীজতলা নষ্ট হওয়া কৃষকদের তথ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে চাহিদা দেওয়া হয়েছে। তবে কৃষি অফিস থেকে নিয়মিত কৃষকদের নানাভাবে পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।

প্রিন্ট করুন

বিভাগ: রংপুর,সারাদেশ