শাবনূরকে বিয়ে করে দুই স্ত্রী নিয়ে সংসার করতে চেয়েছিলেন সালমান শাহ

বিডি সংবাদ টোয়েন্টিফোর ডটকম: দীর্ঘ ২৪ বছর পর নব্বইয়ের দশকের জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করতে পেরেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ঢাকাই চলচ্চিত্রের এই অমর নায়কের মৃত্যু ‘হত্যা না আত্মহত্যা’- এ নিয়ে গত প্রায় আড়াই দশক ধরে চলা জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) বলছে, ‘হত্যা নয়, আত্মহত্যাই করেছিলেন সালমান শাহ। শাবনূরকে বিয়ে করে দুই স্ত্রী নিয়ে সংসার করতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু স্ত্রী সামিরা সতীনের ঘর করতে রাজি ছিলেন না। এখান থেকেই পারিবারিক ও দাম্পত্য জীবনে কলহের শুরু।’

পিবিআই জানিয়েছে, তাছাড়া আগে থেকেই সামিরার শ্বাশুড়ির সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদের ফলে সালমান শাহ ১৯৯১ সালে দু’বার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। সেসময় সালমান শাহ একবার ৯০টি ঘুমের ট্যাবলেট খেয়েছিলেন এবং একবার সেভলন খেয়েছিলেন। প্রতিবেদনে পিবিআই তার আত্মহত্যার পেছনে পাঁচটি কারণও তুলে ধরেছে। চিত্রনায়িকা শাবনূরের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে পারিবারিক কলহের জেরে সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছিলেন বলে জানিয়েছে তদন্ত সংস্থা পিবিআই।

সোমবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে ধানমন্ডিতে পিবিআই সদর দফতরে সংবাদ সম্মেলন করে এমন তথ্য জানান সংস্থাটির প্রধান বনজ কুমার মজুমদার।

প্রায় ৬০০ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন তুলে ধরে বনজ কুমার বলেন, ‘৪৪ জনের জবানবন্দিসহ সার্বিক তদন্তে দেখা যাচ্ছে, চিত্রনায়ক সালমান শাহ পারিবারিক কলহের জেরে আত্মহত্যা করেছেন। হত্যার অভিযোগের কোনও প্রমাণ মেলেনি।’

ওই সময়ের জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা শাবনূরের সঙ্গে জুটি বেঁধে বেশকিছু ব্যবসা সফল চলচ্চিত্র উপহার দিয়েছিলেন সালমান শাহ। এই জুটির রসায়নও ছিল আলোচিত। পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদন বলছে, শাবনূরের সঙ্গে তার অতিরিক্ত অন্তরঙ্গ সম্পর্ক সালমান শাহর আত্মহত্যার অন্যতম কারণ।

পিবিআই প্রধান বনজ কুমার বলেন, ‘শাবনূরের সঙ্গে এই অন্তরঙ্গ সম্পর্কের পাশাপাশি আরও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে স্ত্রী সামিরার সঙ্গে দাম্পত্য কলহ ছিল সালমান শাহর। এছাড়া মায়ের প্রতি তার অসীম ভালোবাসা এবং জটিল সম্পর্কের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে পুঞ্জিভূত আবেগ অভিমানে রূপ নিয়েছিলে সালমানের। সন্তান না হওয়ায় দাম্পত্য জীবনে অপূর্ণতাও ছিল তার।’ব্রেকিংনিউজ

তিনি বলেন, ‘সালমান শাহ ছিলেন অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ। যে কারণে একাধিকবার আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছেন তিনি। এসবকিছু মিলিয়েই শেষ পর্যন্ত সালমান শাহ আত্মহত্যাকে নিজের জীবন শেষ করার পথ হিসেবে বেছে নেন।’

এদিকে, সালমান শাহর স্ত্রী সামিরা ও সহ-অভিনেতা শাবনূরের সঙ্গে কথোপকথনে বিপরীতধর্মী বক্তব্য পেয়েছে পিবিআই।

সামিরার বরাত দিয়ে পিবিআই প্রধান বলেন, ‘শাবনূরকে বিয়ে করে সালমান শাহ দুই স্ত্রী নিয়ে সংসার করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সামিরা রাজি ছিলেন না। এখান থেকেই পারিবারিক দাম্পত্য কলহের শুরু হয়। তাছাড়া আগে থেকেই সামিরার শ্বাশুড়ির সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদের ফলে সালমান শাহ ১৯৯১ সালে দু’বার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। সেসময় সালমান শাহ একবার ৯০টি ঘুমের ট্যাবলেট খেয়েছিলেন এবং একবার সেভলন খেয়েছিলেন।’

তবে সালমান শাহর সঙ্গে অতিরিক্ত অন্তরঙ্গ সম্পর্কের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন শাবনুর। এই চিত্রনায়িকার বরাত দিয়ে পিবিআই প্রধান বলেন, ‘একজন অভিনয় শিল্পী হিসেবে সহযোগী শিল্পীর সঙ্গে যেমন সম্পর্ক থাকা প্রয়োজন, সালমান শাহর সঙ্গে তার তেমন সম্পর্কই ছিল। এর বাইরে কোনও সম্পর্ক ছিল না।’

বনজ কুমার বলেন, ‘১০ জন সাক্ষীর ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি পর্যালোচনা করে এবং ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকসহ সবার মতামত বিশ্লেষণ করে প্রমাণ পাওয়া যায়, সালমান শাহ খুন হননি, তিনি আত্মহত্যা করেছেন।’

বনজ কুমার জানান, পিবিআই তাদের তদন্তের ক্ষেত্রে যেসব বিষয় বিবেচনা করেছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে- প্রথম ও দ্বিতীয় সুরতহাল প্রতিবেদন, প্রথম ও দ্বিতীয় ভিসেরা প্রতিবেদন, কেমিক্যাল প্রতিবেদন, প্রথম ও দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, বিশেষ মেডিকেল বোর্ডের মতামত, হস্তলিপি বিশারদের মতামত, ঘটনাস্থল পরিদর্শন ও ভবনে প্রবেশ ও বের হওয়া সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞের মতামত।

এছাড়া রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদ ও জরিনা বেগমের অডিও রেকর্ড, সাক্ষীদের ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দেয়া জবানবন্দি, ঘটনা সংশ্লিষ্ট সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ শেষে রেকর্ড করা ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ধারায় দেয়া জবানবন্দি, জব্দ করা আলামত পর্যালোচনা, আগের তদন্ত প্রতিবেদনগুলো পর্যালোচনা এবং বিভিন্ন দালিলিক সাক্ষ্য, পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য, কাগজপত্র ও অন্যান্য সাক্ষ্য পর্যালোচনার বিষয়গুলোও পিবিআইয়ের তদন্তে বিবেচনা করা হয়েছে।

প্রসঙ্গত, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মারা যান চলচ্চিত্র অভিনেতা চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন ওরফে সালমান শাহ। সে সময় এ বিষয়ে অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করেছিলেন তার বাবা প্রয়াত কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী।

এরপর ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে অভিযোগ এনে মামলাটিকে হত্যা মামলায় রূপান্তরিত করার আবেদন জানান তিনি। ওই সময় অপমৃত্যুর মামলার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগের বিষয়টি একসঙ্গে তদন্ত করতে থানা পুলিশের পরিবর্তে সিআইডিকে নির্দেশ দেন আদালত।

তদন্তের পর ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় সিআইডি। চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সালমান শাহের মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করে সংস্থাটি। ওই মাসের ২৫ নভেম্বর ঢাকার সিএমএম আদালতে প্রতিবেদনটি গৃহীত হয়। কিন্তু সিআইডির প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে তার বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী রিভিশন মামলা দায়ের করেন। এর ফলে ২০০৩ সালের ১৯ মে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠায় আদালত। এরপর প্রায় ১৫ বছরে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে ছিল।

পরে ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট ঢাকার সিএমএম আদালতের বিচারক বিকাশ কুমার সাহার কাছে বিচার বিভাগীয় তদন্তের প্রতিবেদন দাখিল করেন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ইমদাদুল হক। ওই প্রতিবেদনেও সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। আবারও ২০১৪ সালের ২১ ডিসেম্বর সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী ছেলের মৃত্যুতে বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেন এবং বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি দেবেন বলে আবেদন করেন।

২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি নীলা চৌধুরী ঢাকা মহানগর হাকিম জাহাঙ্গীর হোসেনের আদালতে বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনের নারাজির আবেদন দাখিল করেন। নারাজি আবেদনে উল্লেখ করা হয়, আজিজ মোহাম্মদ ভাইসহ ১১ জন তার ছেলে সালমান শাহর হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন।

পরে মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয় র‍্যাবকে। কিন্তু র‍্যাবের তদন্ত চলাকালে বেশ কয়েকবার শুনানি নিয়ে ২০১৬ সালের ১৯ মে মহানগর দায়রা জজ কামরুল হোসেন মোল্লা বিব্রত বোধ করে ঢাকার ৬ নম্বর বিশেষ জজ আদালতে মামলার নথি পাঠিয়ে দেন। এ আদালতের বিচারক মো. ইমরুল কায়েস ওই বছরেরই ২১ আগস্ট র‍্যাবের মাধ্যমে পুনঃতদন্তের (অধিকতর) আদেশ আইনসম্মত হয়নি উল্লেখ করে বিষয়টি আবারও শুনানি নেওয়ার জন্য ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমকে দায়িত্ব দেন।

এর ধারাবাহিকতায় মহানগর হাকিম লস্কর সোহেল রানা নারাজি আবেদনের ওপর আবারও শুনানি নেন। পরে ৭ ডিসেম্বর শুনানির পর সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনা ‘হত্যা না আত্মহত্যা’ তা নির্ধারণের জন্য র‍্যাবের বদলে পিবিআইকে দায়িত্ব দেন।

প্রিন্ট করুন

বিভাগ: বিনোদন