সংস্কার আর সংস্কৃতের মেলবন্ধন

সাহিত্য পাতা অনলাইন ডেস্ক : সংস্কার শব্দের গঠন হচ্ছে সম্ + কৃ + ঘঞ ভাবে, স আগম। সংস্কার অর্থ শুদ্ধি বিশেষত শাস্ত্রীয় অনুষ্ঠানাদি দিয়ে শোধন (এই বালকের সংস্কার করিয়াছেন তখন কি না সম্ভব হইতে পারে- ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর; সাহিত্যবিচারমূলক গ্রন্থ পড়বার সময় প্রায়ই কমবেশি পরিমাণে যে জিনিসটি চোখে পড়ে সে হচ্ছে বিচারকের বিশেষ সংস্কার, এই সংস্কারের প্রবর্তনা ঘটে তাঁর দলের সংশ্রব, তাঁর শ্রেণীর টানে, তাঁর শিক্ষার বিশেষত্ব নিয়ে- সাহিত্যবিচার, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; সংস্কার মানেই প্রতিষ্ঠিতের সহিত বিরোধ এবং অত্যন্ত সংস্কারের চেষ্টাই চরম বিরোধ বা বিদ্রোহ- সমাজধর্মের মূল্য, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়; সংস্কার ও লোকাচারের জালে আমরা জড়িত, কিন্তু মহাভারতের প্রশস্ত ক্ষেত্রে একটা মুক্তির হাওয়া আছে- মহাত্মা গান্ধী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; য়িহুদার বিধি আছে বলিয়া ইংরেজদিগের এ সংস্কার কিন্তু তুমি আমি য়িহুদী বিধি ঈশ্বরবাক্য বলিয়া মানি না- বিষবৃক্ষ, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়), মেরামত, আজন্ম ধারণা বা ঝোঁক (প্রকৃত ব্যক্তিকে হার দিয়াছেন বলিয়া তাঁহার সংস্কার ছিল- ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর), ভুল সংশোধন, অস্ত্রাদি শাণিতকরণ, প্রসাধন (মেয়েটি এখন অঙ্গসংস্কারে ব্যস্ত)।
সংস্কার শব্দের আরেকটি অর্থ হচ্ছে শাস্ত্রাভ্যাসজনিত বাসনা। এটা তিন প্রকার- বেগাখ্য সংস্কার, স্থিতিস্থাপক সংস্কার ও ভাবনাখ্য সংস্কার।
আবার হিন্দুশাস্ত্রে দশবিধ সংস্কারের পরিচয় জানা যায়। যেমন বিবাহ, গর্ভাধান, পুংসবন, সীমান্তোন্নয়ন, জাতকর্ম, নামকরণ, অন্নপ্রাশন, চূড়াকরণ, উপনয়ন ও সমাবর্তন। এ ছাড়া মন্ত্রের দশবিধ সংস্কার হচ্ছে জনন, জীবন, তাড়ন, বোধন, অভিষেক, বিমলীকরণ, আপ্যায়ন, তর্পণ, দীপন ও গুপ্তি।
আবার ভাষা হিসেবে সংস্কৃতের আদি নাম ছিল সংস্কৃতা বাক্। পরবর্তীকালে এটার নাম হয় সংস্কৃত ভাষা। শাব্দিক অর্থে সংস্কৃত ভাষা মানে পরিমার্জিত ভাষা। এটা একটি ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা এবং হিন্দু ও বৌদ্ধধর্মের পবিত্র দেবভাষা। বর্তমানে এটা ভারতের ২২টি সরকারি ভাষার অন্যতম এবং উত্তরাখণ্ড রাজ্যের অন্যতম সরকারি ভাষা।
সংস্কৃতের প্রাক-ধ্রুপদী রূপটি বৈদিক সংস্কৃত নামে পরিচিত। এই ভাষা ঋগ্বেদের ভাষা এবং সংস্কৃতের প্রাচীনতম রূপ। এর সর্বাপেক্ষা প্রাচীন নিদর্শনটি খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দ নাগাদ রচিত।
সংস্কৃত শব্দটি ক্রিয়া-বিশেষণ। এটার আক্ষরিক অর্থ সংযুক্ত করা, উন্নত ও সম্পূর্ণ আকারপ্রাপ্ত, পরিমার্জিত বা সুপ্রসারিত। শব্দটি সংস্কার ধাতু থেকে উৎসারিত; যার অর্থ সংযুক্ত করা, রচনা করা, ব্যবস্থাপনা করা ও প্রস্তুত করা। সং শব্দের অর্থ সমরূপ এবং (স্)কার শব্দের অর্থ প্রস্তুত করা। এই ভাষাটিকে সংস্কৃত বা পরিমার্জিত ভাষা মনে করা হয়। এই কারণে এই ভাষা একটি পবিত্র ও অভিজাত ভাষা। এই ভাষাকে ‘দেবভাষা’ বলা হতো। কারণ প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী এই ভাষা ছিল ‘দেবগণ ও উপদেবতাগণের ভাষা’।
ঋগ্বেদ থেকে উপনিষদের কাল পর্যন্ত এ ভাষা বৈদিক ভাষা নামে পরিচিত। প্রাচীনকালে সাধারণ্যে যে ভাষা প্রচলিত ছিল তাকে কেবল ‘ভাষা’ বলা হতো। পরে সংস্কারের মাধ্যমে গৃহীত হওয়ায় এর নাম হয় ‘সংস্কৃত’ (সম্-কৃ+ক্ত)।
সংস্কৃত ভাষার নিজস্ব কোনো বর্ণমালা নেই। যে অঞ্চলে এর চর্চা হয়েছে সেই অঞ্চলে প্রচলিত বর্ণমালাই এতে গৃহীত হয়েছে। তবে নাগরী বা দেবনাগরী বর্ণমালা সংস্কৃতের জন্য ব্যাপকভাবে গৃহীত, বোধ্য ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।
ভাষা অর্থে ‘সংস্কৃত’ শব্দের প্রথম ব্যবহার দেখা যায় রামায়ণে (সুন্দরকাণ্ড, ৩০/১৭-১৮)।
সংস্কৃত বিভক্ত্যন্ত্য ভাষা। এ ভাষায় কারক-বিভক্তি, প্রত্যয় ও উপসর্গের ভূমিকা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বাক্যে ব্যবহৃত বিভক্তিযুক্ত শব্দকে বলা হয় ‘পদ’; বিভক্তিহীন কোনো শব্দ বাক্যে ব্যবহৃত হয় না। তাই বাক্যমধ্যে পদের অবস্থান পরিবর্তনে বাক্যের অর্থপরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনা থাকে না; আর এ কারণে বাক্যগঠনে শব্দের অবস্থানের কোনো বাঁধাধরা নিয়ম নেই। ব্রেকিংনিউজ/

প্রিন্ট করুন

বিভাগ: সাহিত্য পাতা