স্বাস্থ্য সুরক্ষায় পুষ্টিকর ভেষজ খাদ্য সংযোজন

স্বাস্থ্য ডেস্ক: খাদ্য সংযোজন (Food supplement) কিংবা নিউট্রাসিউটিক্যালস (Nutraceuticals)হলো সেই সকল খাদ্যসমূহ যা গ্রহনে শরীরের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, ভিটামিন ও মিনারেলস এর ঘাটতি পূরণের করে স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়। প্রতিদিন আমরা যে নিয়মিত আহার গ্রহন করি তাতে কিছুটা হলেও শরীরে পুষ্টির ঘাটতি থেকে যায়। প্রতিদিনের এই সকল পুষ্টি-ঘাটতির দরুন ধীরে ধীরে বাসা বাঁধে নানান রকম শারীরিক রোগ-ব্যাধি ও মানসিক জটিলতা। নিয়মিত আহার গ্রহনের পাশাপাশি যদি সঠিক মানের ও সঠিক দিক নির্দেশনায় প্রাকৃতিক উৎস থেকে তৈরি খাদ্য সংযোজন অথবা খাদ্য সম্পূরক গ্রহন করা হয় তাহলে অনেকাংশেই শরীরের যাবতীয় পুষ্টির অভাব পূরনের মাধ্যম দিয়ে সৃষ্ট নানান রকম শারীরিক রোগ-ব্যাধি ও মানসিক জটিলতা সমূহকে প্রতিরোধ ও প্রতিকার করা সম্ভব। প্রাকৃতিক উৎস বলতে এখানে বোঝানো হয়েছে সম্পূর্ন ক্যামিকেল ও সিনথেটিক উপাদানমুক্ত, যেমন ঔষধি গাছ, প্রো ও প্রি বায়োটিক কিংবা সামুদ্রিক উপাদান (শৈবাল) ইত্যাদি।

আধুনিক বিজ্ঞানের কল্যাণে গবেষণা করে জানা গেছে ভেষজ খাদ্য সম্পূরক সমূহে ঔষধি গুণসম্পন্ন জৈব উপাদানের একটি সমষ্টি (ফাইটো-ক্যামিকেলস) বিদ্যমান থাকে যা মানব শরীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টির যোগান প্রদানের মাধ্যম দিয়ে শরীরকে রাখে সুস্থ-সবল ও রোগ প্রতিরোধে করে সহায়তা। ফলে মনও থাকে প্রফুল্ল।

ফাইটো-ক্যামিকেলস কিভাবে কাজ করে- 
কার্যকরী ভেষজ উপাদানসমূহ (ফাইটো-ক্যামিকেলস) যথা এন্টি-অক্সিডেন্টস (যেমন ভিটামিন এ, সি, ই এবং মিনারেল সেলেনিয়াম) শরীরের রক্তে বিদ্যমান ক্ষতিকর কণাসমূহ ধ্বংস করে যা হার্টকে সুরক্ষা রাখতে সহায়তা করে। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য এন্টি-অক্সিডেন্টস যেমন এলাইল সালফাইডস (পেয়াজ, রসুন) ক্যারোটিনয়ডস (গাজর, টমেটো, ফলমূল); ফ্ল্যাবোনয়ডস (ফলমূল, শাকসবজি); পলিফেনোলস (চা, আংঙ্গুর) ইত্যাদি। রসুনে বিদ্যমান এলিসিন ব্যাক্টেরিয়া প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে; স্যাপোনিন্স যা পাওয়া যায় শিম জাতীয় সবজিতে ক্যান্সার কোষ বৃদ্ধি প্রতিরোধ করে, কোলেস্টেরল এর মাত্রা কমাতে সহায়ক; বাঁধাকপিতে বিদ্যমান ইনডোলস ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়।

বাংলাদেশে ভেষজ খাদ্য সংযোজন- 
আমরা প্রতিদিনই অনেক ধরনের খাবার গ্রহন করে থাকি, হোক সেটা অফিস, বাসা কিংবা বন্ধুদের সাথে আড্ডায়। কিন্তু আমরা যে সমস্ত খাদ্যবস্তু নিত্যদিন জীবন যাপনের সাথে গ্রহন করি সেগুলোর কতটুকু নিরাপদ ও পুষ্টি মানের দিক দিয়ে কতটা স্বাস্থ্য সহায়ক তা নিয়ে আমরা কেউই খুব বেশি সচেতন নই। অথচ খাদ্যে উপস্থিত পুষ্টি মানের উপরই ভিত্তি করে আমাদের শরীরের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা নির্ভর করে, একই সাথে নির্ভর করে মানসিক উৎকৃষ্টতা।

বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ প্রাকৃতিক খাদ্য সংযোজন নিয়ে গবেষনামূলক কাজ করছে এবং গবেষকদের মধ্যে আগ্রহও বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান প্রাকৃতিক খাদ্য সংযোজনের গুরুত্ব অনুধাবন করে বাজারে ছেড়েছে ভিন্ন ভিন্ন ধরনের ভেষজ খাদ্য উপাদান যেগুলো পাওয়া যাচ্ছে পাউডার, ক্যাপসুল কিংবা তেল আকারে। তবে যে পরিমাণ নিউট্রাসিউটিক্যালস কিংবা ফাংশনাল ফুড জাতীয় পণ্য বাজারে আছে সেই পরিমাণ জনসচেতনতা এখনো দেশে গড়ে উঠতে পারেনি। এর মূল কারণ দেশীয় কিছু সস্তা নিম্ন মানের হারবাল ঔষধালয় যারা জনমনে মনগড়া বিভ্রান্তিকর ও বিব্রতকর তথ্য বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচার করে বেড়ায় নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থে। একই সাথে বিজ্ঞান সম্মত জ্ঞ্যান ও প্রচারণার অভাব এবং পন্যের গুনগত মান নিশ্চিতের অভাব থেকেও জনমনে এই সকল পন্যের কার্যকারীতা ও ব্যবহার নিয়েও সৃষ্টি হয় নানান রকম মতযুক্ত বিবাদ ও কুসংস্কার। ফলে মানুষের মনে ভেষজ খাদ্য সামগ্রী নিয়ে আস্থার জায়গাটি এখনো সুদূর বিস্তৃত হতে পারেনি। অথচ উন্নত বিশ্বের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই তারা কতটা সচেতন ও কতটা আগ্রহী প্রাকৃতিক ভেষজ খাদ্য সামগ্রী কিংবা ফাংশনাল ফুড অথবা নিউট্রাসিউটিক্যাল বিষয়ক পণ্যের গবেষণা, উৎপাদন ও প্রসারে।

বাংলার মানুষ  আধুনিক ও উন্নত জীবন যাপনের গ্যাঁড়াকলে পড়ে দিন দিন সেই প্রচলিত প্রাকৃতিক খাদ্য সামগ্রী গ্রহন করা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। ফলে বৃদ্ধি পাচ্ছে অনেক জটিল জটিল রোগসমূহ, বিশেষত ক্যান্সার ও ডায়াবেটিস। খাদ্যে বিদ্যমান পুষ্টিমানও কমে যাচ্ছে নানান রকম বিষাক্ত ক্ষতিকর কীটনাশক, ছত্রাকনাশক এবং রাসায়নিক সারের যত্রতত্র ব্যবহারের দরুন। প্রাকৃতিক পুষ্টির বদলে খাদ্যে ঢুকে যাচ্ছে এই সমস্ত মরনঘাতী রাসায়নিক উপাদান, এছাড়া খাদ্যে ভেজাল মেশানো তো আছেই। ফলে দেশের জনস্বাস্থ্য দিন দিন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে অগ্রসর হচ্ছে, বাড়ছে মানুষের ভোগান্তি ও সামাজিক নৈরাজ্য। শরীর ভালো থাকলে মন ভালো থাকে, মন ভালো থাকা মানেই একটি সুন্দর, পরিচ্ছন্ন বুদ্ধিদীপ্ত সমাজ ব্যবস্থা। তাই নিরাপদ অধিক পুষ্টিযোগ্য প্রাকৃতিক খাদ্য উৎপাদন ও গ্রহনের উপর বাংলাদেশ সরকারের গবেষনামূলক কর্মকাণ্ড জোরদার করতে হবে এবং জনগণকে সঠিক বিজ্ঞান ভিত্তিক তথ্য উপাত্ত সরবারহের মাধ্যম দিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য গণমাধ্যম সমূহকেও এগিয়ে নিয়ে আসতে হবে।

লেখক: জীবপ্রযুক্তিবিদ, টেকবি নিউট্রিজেনোমিক্স, বাংলাদেশ।

প্রিন্ট করুন

বিভাগ: স্বাস্থ্য