অনিয়ম-দুর্নীতির শিকড়ে বাধাঁ লালমনিরহাট জেলার শিক্ষার্থীর ভবিষৎ

0 732

Lalmonirhatজিন্নাতুল ইসলাম জিন্না, লালমনিরহাট : ২০১৩ সালে সারাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার ফলাফলে লালমনিরহাট জেলার শিক্ষার মানউন্নয়নে প্রথম স্থান অধিকার করেছিল। বর্তমানে এ জেলার প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার মান অত্যন্ত নাজুক। বিশেষ করে উপজেলা পর্যায়ে শিক্ষা সংক্রান্ত অনিয়ম ও দুর্নীতি সবার শীর্ষে। আর এ অবস্থা সৃষ্টির পিছনে রয়েছেন প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের দায়িত্বে থাকা দুর্নীতিবাজ টিও, এটিওগন।
অনুসন্ধানে জানা যায় লালমনিরহাটের ৫ উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন দুর্নীতির বিষয় গুলো। এসব দুর্নীতিবাজরা শিক্ষা অফিসে যোগদানের পর থেকে সু-কৌশলে শিক্ষা সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে লক্ষ লক্ষ টাকা কৌশলে হাতিয়ে নিয়ে আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ বনে গেছেন।
সরেজমিনে তদন্তকালে জানাযায়, রক্স প্রকল্পের মাধ্যমে উপকরন ক্রয়, শিক্ষক প্রশিক্ষন, পোষাক ক্রয়, উপবৃত্তি বিতরন, শিক্ষকদের মাসিক বেতন প্রদান, ভুলে ভরা প্রশ্নপত্র ও নিম্নমানের খাতা সরবরাহ, প্রাথমিক শিক্ষকদের ডিজিটালাইজড করন, ছিলিপের টাকা, রুটিন মেরামতের টাকাসহ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের টয়লেট সংস্কারে বরাদ্দকৃত টাকার অধিকাংশ অর্থ আত্মসাৎসহ  জেলার ৫ উপজেলার অনেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিশেষ বরাদ্দের সমুদয় অংশ লুটপাটেরও অভিযোগ উঠেছে। একাধিক উপজেলার  কোন কোন সরকারী প্রতিষ্ঠানের টিও, এটিওগণ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাগনের দেয়া দায়িত্ব পালনে অবহেলা করছেন।
পাটগ্রামের উপজেলায় ভারপ্রাপ্ত টিও ও এটিওগন জুটিবদ্ধ হয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) অজান্তে প্রভাব বিস্তার ও শিক্ষা কর্মকর্তার সাথে আতাত করে শিক্ষকদের বিভিন্ন ভাবে হয়রানি করে আসছেন। তাদের কুটনৈতিক ষড়যন্ত্রে এ শিক্ষা অফিসে অন্যান্য কর্মকর্তাগণ  চাকুরি করতে নিরুসাহী হওয়ায়  বর্তমানে সেখানে জনবল সংকট দেখা দিয়েছে। তাদের এমন কর্মকান্ডে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন শিক্ষক-কর্মচারীগন। যার কারনে সেখানে যে কোন মহুর্তে ঘটতে পারে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক বলেন, আমরা তাদের কাছে খেলার পুতুল, কার কথা কে শোনে। এমন অযোগ্য টিও, এটিও’দের সাথে কাজ করা মানেই নিজের কাজকে ও স্কুলে পড়াশুনা করতে আসা ছেলে-মেয়েদের ফাঁকি দেয়া। পাটগ্রাম উপজেলা থেকে পাশর্^বর্তী নীলফামারী জেলার দুরত্ব মাত্র কয়েক কিলোমিটার। আর পাটগ্রাম উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের দায়িত্বরত টিও এটিও সহ অধিকাংশ কর্মকর্তার বাড়ি ওই জেলার জলঢাকা উপজেলায় হওয়ায় তাদের মাঝে অফিস ফাঁকির প্রবনতাও লক্ষনীয়। এছাড়াও দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্বে থাকা ইউআরসি ইন্সপেক্টর লুৎফর রহমানের বিরুদ্ধেও নানা অভিযোগ। মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে একই শিক্ষককে একাধিক প্রশিক্ষনে অন্তর্ভুক্ত করে শিক্ষকদের মাঝে সমালোচিত হয়েছেন তিনি। এছাড়াও প্রশিক্ষনের উপকরন ক্রয়ের বরাদ্দকৃত টাকা ভুয়া বিল-ভাউচার দিয়ে হাজার হাজার টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তার এহেন অনিয়ম ও দূর্নীতির কারনে অত্র উপজেলার প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থীর ভবিষৎ অন্ধকার হয়ে পড়েছে। আর এ জন্য হতাশায় ভুগতে হচ্ছে তাদের অবিভাবকগণকে।
চলমান এই শিক্ষা পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে অভিভাবক হোসেন আলী বলেন, সরকার শিক্ষা ব্যবস্থার মান উন্নয়নের কথা বিবেচনা করে দেশের অধিকাংশ স্কুল জাতীয়করন করেছেন। আর জাতীয়করন করার পর এসব স্কুলে অদক্ষ শিক্ষক নিয়োগ, অতিরিক্ত বেতনবৃদ্ধিসহ বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা অব্যাহত থাকায় প্রাথমিক শিক্ষার ভবিষৎ হতাশাজনক। তাই তিনি শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের উর্দ্ধতন কর্মকর্তার প্রতি যোগ্যতা সম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগের দাবী জানান। পাশাপাশি নিয়োগকৃত শিক্ষকদের যথাযথ দায়িত্ব পালনের দাবী জানানো হয়।
আদিতমারী, কালীগঞ্জ, হাতিবান্ধা ও লালমনিরহাট সদরেও একই অবস্থা লক্ষ্য করা যায়। আদিতমারী উপজেলার পুরাতন ভেলাবাড়ী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক মোঃ আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে ছেলেকে মেয়ে বানিয়ে উপবৃত্তির টাকা আতœ্যসাতের অভিযোগ উঠেছে। সরেজমিনে ওই বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের উপবৃত্তির চাহিদার কাগজপত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিজের ছেলের নামসহ ১৪টি নামের উপবৃত্তির টাকা দীর্ঘদিন থেকে উত্তোলন করে আত্মসাৎ করে আসছেন। অথচ ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষকের কোন ছেলে-মেয়েই পড়াশুনা করে না। এ মর্মে ওই বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মোঃ সুরুজ্জামান বিভিন্ন সরকারী দপ্তরে একটি অভিযোগ প্রেরন করেছেন। উল্লেখিত দুর্ণীতির তদন্ত গত ২২ আগষ্ট হওয়ার কথা থাকলেও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ইয়াছিন আলী জানান, প্রধান শিক্ষক সময়ের আবেদন করায় তদন্তের তারিখ পিছিয়ে দেয়া হয়েছে। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার নিজেই এই দূর্ণীতির সাথে জড়িত থাকার কারনে বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার অপচেষ্টা চলছে বলে অবিভাবক মহল মনে করছেন।
এদিকে আদিতমারী উপজেলা নির্বাহী অফিসারের পদ শুণ্য থাকায় অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাহীনুর আলম। এই সুযোগে আদিতমারী উপজেলার দুর্নীতিবাজ শিক্ষা কর্মকর্তা ও শিক্ষকরা অনেকটা ফাকা মাঠে গোল করে যাচ্ছেন।
অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে পাটগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নূর কুতুবুল আলমের সাথে কথা হলে তিনি জানান, জনবল সংকট এর কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তবে শিক্ষা অফিসে আনিত অভিযোগ গুলো তদন্ত সাপেক্ষে দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে তিনি আশ্বাস দেন। এ বিষয়ে শিক্ষা কমিটির সভাপতি পাটগ্রাম উপজেলা চেয়ারম্যান রুহুল আমীন বাবুল বলেন, বিষয় গুলোর তদন্ত চলমান রয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে  ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোঃ নবেজ উদ্দিন বলেন, কোন কোন উপজেলায় এ রকম অভিযোগ রয়েছে, এসব বিষয়ে তদন্ত পূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি আরও বলেন, দুর্ণীতিবাজ কয়েজন কর্মকর্তার কারনে উপজেলা গুলোতে প্রাথমিক শিক্ষার মান কিছুটা নি¤œমুখী হলেও, খুব তারাতারি সেই সমস্যা গুলোর সমাধান হবে।

(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

Leave A Reply

Your email address will not be published.

x