কুড়িগ্রামের রৌমারী ঐতিহাসিক বড়াইবাড়ি যুদ্ধু দিবস আজ

১,০৩৩

মাজহারুল ইসলাম,রৌমারী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি: আজ ঐতিহাসিক বড়াইবাড়ি দিবস, ২০০১ সালের ১৭ এপ্রিল দিবাগত গভীররাতে ভারতীয় বিএসএফ ভারত বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সীমানা পিলার ৬৫ থেকে ৬৭ পিলার অতিক্রম করে বড়াইবাড়ি ক্যাম্প এলাকায় প্রায় কয়েক প্লাটুন বিএসএফ অনধিকার প্রবেশ করেছিলেন। কিন্ত রাত গভীর ও অন্ধকার হওয়ায় সেচ-পাম্পে গিয়ে মিনহাজ নামে এক কৃষককে বড়াইবাড়ি বিজিবি ক্যাম্পের নিশানা জানতে চায়।

কিন্ত দেশ প্রেমিক সুচতুর মিনহাজ ভারতীয বিএসএফকে ভুলে পথে দিকনির্দেশনা দিয়ে দূত বিজিবি ক্যাম্পে এসে ঝাকে ঝাকে বিএসএফ বিজিবি ক্যাম্প ঘেরাও করতে আসছে এমন খবর বিজিবিকে জানালে বিজিবি শক্ত হাতে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন  প্রতিশোধের নেশায় উন্মত্ত হয়ে বিএসএফ বড়াইবাড়ি আক্রমণের পরিকল্পনা করে, যেটা ছিলো সিলেটের পাদুয়া থেকে ২৫০ কিলোমিটার পশ্চিমে কুড়িগ্রাম জেলায় অবস্থিত ।

তাদের উদ্দেশ্য ছিলো মহেন্দগঞ্জ-কামালপুর পাকা সড়ক নির্মাণ সহজ করা ও বড়াইবাড়ির চার কিলোমিটার অতি জমি ভারতের দখলে আনা। সে লক্ষ্যে ভারতের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন সেনাঘাঁটি থেকে তিন প্লাটুন ‘ক্যাটস আই কমান্ডো’ ও অতিরিক্ত আরো দুইশো বিএসএফ জওয়ান গোপনে বাংলাদেশের ওপারে এসে অবস্থান নেয়। সাথে প্রস্তুত করে রাখা হয় বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র ও গোলা বারুদ। এটা স্পষ্টতই আন্তর্জাতিক আইন পরিপন্থী। একটি স্বাধীন দেশের সার্বভৌমত্বের উপর সরাসরি আঘাত করার হীন চক্রান্ত।

সে রাতে বড়াইবাড়ি বিডিআর ক্যাম্পে দেশের একাংশ পাহারা দিচ্ছিলেন মাত্র এগারোজন বিডিআর জওয়ান। পর্যবেক্ষণ টাওয়ার ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের তেমন সুব্যবস্থা না থাকায় কমান্ডার নজরুল ইসলাম দিনের বেলায় ভারতীয় হায়েনাদের প্র¯ততি সম্পর্কে তেমন কিছুই জানতে পারেননি। তবে তার সতর্কচিত্ত অজানা বিপদের গন্ধ পেয়েছিলো যখন বিকাল পাঁচটায় কোন ধরণের উপলক্ষ ছাড়াই বিএসএফের পক্ষ থেকে পতাকা বৈঠকের চিঠি আসে। তা ছিলো মূলত একটি ফাঁদ। তিনি চিঠির কোন সাড়া না দিয়ে সৈন্যদেরকে সজাগ দৃষ্টি রাখার নির্দেশ দিলেন।

২০০১ সালের ১৮ এপ্রিল রাত তিনটা বাজে তখন। অসংখ্য শহীদের রক্তে কেনা আমাদের পবিত্র ভূমিকে ছিনিয়ে নিতে ভারতীয় কমান্ডো, সেনা ও বিএসএফের যৌথ বাহিনীর প্রায় তিন ব্যাটালিয়ন সদস্য বাংলাদেশের সীমানার ভেতরে ঢুকে পড়ে। এরপরেই আসে মিনহাজের বুদ্ধিদীপ্ত ভূমিকার কথা। বিএসএফ বড়াইবাড়িতে ঢুকলেও সেখানকার বিডিআর ক্যাম্পের অবস্থান নিয়ে একটু দ্বন্ধে ছিলো। মিনহাজকে ধরে জিজ্ঞেস করলে তিনি বিডিআর ক্যাম্প থেকে একটু দূরে ক্যাম্প সাদৃশ্য একটি ঘর দেখিয়ে দিলেন। রাতের অন্ধকারে হানাদার বাহিনী সেটাকেই ক্যাম্প মনে করে ঘিরে ফেলার জন্য তিনদিক থেকে এগুতে শুরু করে।

এই সুযোগে মিনহাজ বিডিআর ক্যাম্পে এসে হাজির। ঘটনা খুলে বলে দূত গ্রামে গিয়ে ছড়িয়ে দেন বিএসএফ অনুপ্রবেশের খবর। দেশ রক্ষা করতে হবে। মাত্র এগারোজন বিডিআর জওয়ানের কাঁধে পুরো দেশের স্বাধীনতার ভার চাপিয়ে আমরা বসে থাকতে পারি না এমন খবরে সাথে সাথে বড়াইবাড়ি ক্যাম্প থেকে ওয়্যারলেসে খবর চলে যায় পার্শ্ববর্তী হিজলমারি ও খেওয়ারচর বিডিআর ক্যাম্পে। কিন্তু তারা আসার আগেই বিএসএফ পুরো ক্যাম্প এলাকাজুড়ে গুলিবৃষ্টি শুরু করে। আক্রমণ শুরু হওয়ার পর বিডিআরের এগারো জওয়ান প্রথম দশ মিনিট টু শব্দও করেননি। এটা ছিলো বিডিআরের মাইন্ড গেমের অংশ। বিপরীত দিক থেকে কোন সাড়া না পেয়ে বোকা বিএসএফ ভেবে বসে বিডিআর বোধ হয় পালিয়েছে।

অন্ধকারে অসতর্ক হয়ে হানাদার বাহিনীর একটি অংশ আসল বিডিআর ক্যাম্পের কাছে আসতেই একযোগে গর্জে উঠলো বাংলাদেশের চারটি মেশিনগান। মিনিটে ৭০০ রাউন্ড গুলি ছোঁড়ার ক্ষমতাসম্পন্ন ভয়ংকর আরপিডি সাবমেশিনগানের আঘাতে মুহুর্তেই কাটা কলাগাছের মতো পড়ে গেলো বেশ ক’জন ভারতীয় সৈন্য। এগারোজন বিডিআরের বুদ্ধিমত্তা ও পাল্টা আক্রমণের প্রচন্ডতায় দিশেহারা হয়ে পালাতে শুরু করে দখলদার ভারতের যৌথবাহিনী। তারা ভেবে বসে, পেছন দিক থেকে অসংখ্য বিডিআর তাদের পুরো বাহিনীকে ঘিরে ফেলেছে। তাই প্রাণ বাঁচাতে এলোপাথাড়ি গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে ভারতের সীমানার দিকে ছুটতে থাকে।

এ লড়াই চলে ৪২ ঘন্টাব্যাপি। সে বার নগ্ন হামলার দাঁতভাঙ্গা জবাব দিয়েছিল বিডিআর ও বীর জনতা। ১৬ জন সৈন্যের লাশ ফেলে কাপুরুষের ন্যায় পালিয়ে গিয়েছিল বিএসএফ। ৩ জন বীর বিডিআর সৈনিক শাহাদাত বরণ করেছিলেন দেশের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখতে। তাঁরা হলেন, ল্যান্স নায়েক ওহিদুজ্জামান, মাহফুজুর রহমান ও আবদুল কাদের। আরো সাতজন বিডিআর সদস্যের পাশাপাশি ছয়জন গ্রামবাসীও আহত হন। গ্রামবাসীর হাতে ধরা পড়ে অক্ষয় কুমার ও বিমল প্রসাদ নামক দুই বিএসএফ হায়েনা। যুদ্ধের প্রথমদিকে ইন্ডিয়া ১৬ জন সৈন্যের নিহত হবার খবর অস্বীকার করে বলে, আমাদের মাত্র ৩ জন বিএসএফ নিহত হয়েছে। কিন্তু বিডিআর যখন এক এক করে ১৬ জন বিএসএফের মরদেহ হস্তান্তরর করে ভারতের কাছে, তখন সত্য স্বীকার করা ছাড়া আর কোন উপায় ছিলোনা।

Comments are closed.