চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাজুড়ে অপসাংবাদিকতায় অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ

88
ফয়সাল আজম অপু: চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাজুড়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে চাঁদাবাজ চক্র। চক্রটি সাংবাদিকতার মতো মহান পেশাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে জেলাজুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। আন্ডারগ্রাইন্ড ও নাম সর্বস্ব পত্রিকা, অনলাইন এবং অনলাইন টিভির নাম ব্যবহার করে প্রতিনিয়ত চাঁদাবাজি করার অভিযোগ উঠেছে। তাঁদের চাঁদাবাজিতে অতিষ্ট হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষসহ সরকারি – বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, নানা অপরাধে জড়িতরা নিজেদের অপকর্ম ঢাকতে সাংবাদিকতাকে টার্গেট করছে। ব্যাঙের ছাতার মতো অনলাইন পোর্টাল ও অনলাইন টিভি খুলে জেলাব্যাপী সাংবাদিক নিয়োগের নামে বাণিজ্য করছে। আর তাতেই রাতারাতি সাংবাদিক বনে যাচ্ছে মাদক কারবারী, বিভিন্ন মামলার আসামী চিহ্নিত প্রতারক ও অপরাধীরা।
তাদের মধ্যে নেই একাডেমিক যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ ও লেখনির কোনো দক্ষতা। চাঁদাবাজি করাই এদের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। টাকার জন্য হুমকী ধামকী দেওয়া যেনো তাদের দৈনন্দিন কাজ। মূলধারার সাংবাদিকদের সাথে তাদের কোন সম্পর্ক নেই। তাঁদের কারণে সুনাম ক্ষুন্ন হচ্ছে মূলধারার সাংবাদিকদের। সেই সাথে কলুষিত হচ্ছে জাতির বিবেক নামক, মহান এই পেশা।
সম্প্রতি জেলার সদর, শিবগঞ্জ, ভোলাহাট, গোমস্তাপুর ও নাচোল উপজেলায় সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন সরকারি বেসরকারী দপ্তরে সাংবাদিক তকমা ব্যবহার করে এসব প্রতারক বুম ও ক্যামেরাসহ এসে চাঁদাবাজী করছে বলে দাবী বিভিন্ন মহলের। উপজেলার বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জ নয় পাশের জেলা রাজশাহী থেকে গাড়ী নিয়ে এসে কিছু সাংবাদিক প্রায় সময় গাড়ি ভাড়া, দুপুরের খাবার ও তাদের সম্মানির কথা বলে মাসে দু’তিনবার বিভিন্ন ভাবে বিরক্ত করে।
তাদের বিরক্তির কারণে সকল কর্মকর্তা অতিষ্ট। এদের মধ্যে অনেকেই প্রশাসনের কাছে মাদক নিয়ে আটকও হয়েছেন। চাঁদাবাজি করতে গিয়ে জেলও খেটেছেন। কেউবা ফায়দা না করতে পেরে এলাকা ছাড়া হয়েছেন। আবার এমনকি দেশ ছাড়ার নজিরও রয়েছে। অনেকেই গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারির কারণে চাঁদার টাকা ফেরত দিয়েছেন এমনও প্রমাণ রয়েছে৷ সাংবাদিকতার নামে চাঁদাবাজি করে যাচ্ছে জেলা সহ – বিভিন্ন উপজেলার এসকল ভুয়া সাংবাদিকরা।
তথাকথিত আইপিটিভি (ইউটিউব), অনলাইন নিউজপোর্টাল ও যত্রতত্র ফেসবুক লাইভ দেখিয়ে প্রতারণা করছে। মোটরসাইকেলে প্রেস লেখা স্টিকার ও আইডি কার্ড ঝুলিয়ে অবাধে চলাচল করছে ওইসব সাংবাদিক নামধারী ব্যক্তি। অথচ তাদের কোনো অনুমোদন নেই। শুধু ইউটিউব ও ফেসবুকে একটি প্রোফাইল তৈরি করে সেটিকে টিভি চ্যানেল অথবা নিউজপোর্টাল হিসেবে ঘোষণা করে প্রচার করা হচ্ছে।
এমনকি নারী নির্যাতন, মাদক, চাঁদাবাজি ব্ল্যাকমেইলিংয়ের সঙ্গে জড়িতরাও সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ার কারণে মাদক সিন্ডিকেট সহ এনজিওর অফিস ও বিভিন্ন দপ্তরে, জোড়ালো কর্মকান্ড চালাচ্ছে। যেখানে – সেখানে অবাধে বিচরণ করছে কিছু ভুয়া সাংবাদিক, সেই সাথে করে যাচ্ছে নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ড।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে কর্মরত দেশের বহুল প্রচারিত কয়েকটি ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার প্রতিনিধি ও সিনিয়র সাংবাদিকরা বলেন, সদর সহ উপজেলার বিভিন্ন স্থান ও সরকারী বেসরকারী দপ্তরে সাংবাদিকতার নামে চাঁদাবাজি ও নানা ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে কার্ডধারীরা ৷
এ ধরনের ভূঁইফোঁড় কথিত সাংবাদিকরা উপজেলার বিভিন্ন এলাকার বাসাবাড়ি, এনজিও, কাস্টম অফিস, বিআরটিএ, পাসপোর্ট অফিস, এলজিইডি, পাউবো, সওজ, সাব-রেজিষ্টার অফিস, পুলিশ ফাঁড়ি, ট্রাফিক অফিস, ক্লিনিক, হাসপাতাল ও নানা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রচারের ভয় দেখিয়ে করছে চাঁদাবাজি।
এছাড়া কেউ খাস জমিতে ভবন নির্মাণ করলেই তাদের কবলে পড়তে হয়। নদী থেকে বালু উত্তোলনকারী, মাদক কারবারী, ইট ভাটার মালিক ও পুকুর খননকারীদের নিউজের হুমকী দিয়ে চাঁদা আদায় করা এখন নিত্য নৈমত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া সভা – সমাবেশসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বুম হাতে, আইডি কার্ড ঝুলিয়ে সিনিয়র সাংবাদিকদের আগেই উপস্থিত হয় সেখানে। এরপর নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে জাহির করতে, ক্যামেরা ও বুম নিয়ে করে নানা অঙ্গভঙ্গি। অনুষ্ঠান শেষে রাজনৈতিক নেতা কিংবা আয়োজকদের পেছনে পেছনে ছোটে মৌমাছির ঝাঁকের মতো ।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের একজন সিনিয়র সাংবাদিক বলেন , অপসাংবাদিকতার কারণে মূলধারার সাংবাদিকদের বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হচ্ছে । এমন বাস্তবতায় তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারি। ভবিষ্যতে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়াতে এসব চাঁদাবাজদের এখনই নিয়ন্ত্রণ করা জরুরী হয়ে পড়েছে বলে মনে করে সচেতন মহল।
সাংবাদিক সংগঠন বিএমএসএফ’র কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম নেতা সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও সোনামসজিদ স্থল বন্দর প্রেসক্লাবের সভাপতি সিনিয়র সাংবাদিক ফয়সাল আজম অপু বলেন, কিছু কার্ডধারী ভূঁইফোড় সাংবাদিকের খবর পত্রিকায় দেখলে মনে হয় সাংবাদিকতা ছেড়ে দেয়। তাদের কর্মকান্ড একজন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীর চেয়ে ভয়ানক৷ মূলধারার সাংবাদিক এসব অপসাংবাদিকদের থেকে পরিত্রান চাই ৷
এ বিষয়ে জেলার আরও কয়েকজন সিনিয়র সাংবাদিক বলেন সাংবাদিকতার নাম ভাঙিয়ে অপকর্মে জড়িতরা আইন – শৃঙ্খলা বাহিনীর পর্যবেক্ষণে রাখা অতীব জরুরী। তাহলে অপসাংবাদিকরা কখনই প্রশ্রয় পাবে না।
x