চীন থেকে সাপ্লাই চেইন সরানো বাস্তবসম্মত নাকি অলীক?

0 119

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : বিশ্ব বাণিজ্যে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠা চীনকে ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদেশগুলো একত্রিত হয়েছে। প্রথমে বাণিজ্যযুদ্ধের মাধ্যম লাগাম টানার প্রয়াস। পরে করোনা ভাইরাস, যা বড় ধরনের সুযোগ এনে দেয়। বাণিজ্যযুদ্ধের অংশ হিসেবেই যুক্তরাষ্ট্র উৎপাদন খাতে চীন নির্ভরতা কমানোর তোড়জোড় চালাচ্ছে। নিজেরা তো চীনের পেছনে লেগেছেই, মিত্র দেশগুলোকেও তাদের দেখানো পথ অনুসরণের তাগাদা দিচ্ছে। আবার করোনার প্রেক্ষিতেও অনেক দেশ উৎপাদন খাতে চীনের প্রভাব কমানোর চেষ্টা করছে। বিশ্বের কারখানা হিসেবে পরিচিত চীন থেকে উৎপাদন সরানো কতটা সম্ভব, তা হয়তো ভবিষ্যৎই বলে দেবে। খবর ব্লুমবার্গ।

ট্রাম্প প্রশাসন এরই মধ্যে সাপ্লাই চেইন চীন থেকে নিজ দেশে সরিয়ে আনার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। এমনকি তারা এশিয়ার বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর প্রতি আহ্বানও জানিয়েছে, তারা যেন জরুরি পণ্য উৎপাদনে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়। গত মাসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলে যুক্তরাষ্ট্র ৫০ হাজার কোটি ডলার সাশ্রয় করতে পারবে।

যুক্তরাষ্ট্র তার সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন চীন থেকে সরানোর যে চেষ্টা চালাচ্ছে, তা কতটা বাস্তবসম্মত? এ বিষয়ে একটা ধারণা পেতে ব্লুমবার্গের পক্ষ থেকে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অন্তত ডজনখানেক সরকারি কর্মকর্তা ও বিশ্লেষককে প্রশ্ন করা হয়েছিল। তাদের সাক্ষাৎকার থেকে যা প্রতীয়মান হয়েছে তা হলো, এখন পর্যন্ত সাপ্লাই চেইন স্থানান্তরের যেকোনো প্রচেষ্টা কেবল আশাবাদী চিন্তাই সাব্যস্ত হয়েছে।

বিভিন্ন দেশের সরকার বিনিয়োগ টানার জন্য জোর চেষ্টা চালাচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে সফল হচ্ছেও। যেমন তাইওয়ান সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্রে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সেমিকন্ডাক্টর কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা করছে।

কিন্তু বাস্তব বিষয় হলো, প্রতিষ্ঠিত কোনো উৎপাদন ব্যবস্থা রাতারাতি অন্য জায়গায় স্থানান্তর করাটা খুব একটা সহজ নয়। বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন করোনার প্রকোপে কোম্পানিগুলো এমনিতেই সংকটের মধ্যে রয়েছে।

এমনিতেই গত এক দশকে ক্রমবর্ধমান মজুরি ও ব্যয়ের কারণে স্বল্পমূল্যের পণ্য উৎপাদকরা তাদের কারখানা চীন থেকে সরিয়ে নিতে শুরু করেছে। বিশেষ করে তারা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সরে যাচ্ছে। বাজার চাহিদাই এ স্থানান্তর প্রক্রিয়ার কারণ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে করোনা ভাইরাসের প্রভাব। মহামারিটির কারণে অর্থনৈতিক ব্যয় বেড়ে গেছে। ফলে বিভিন্ন দেশের নীতিনির্ধারকরা উৎপাদন খাতে স্বনির্ভরতা ও চীনের বিকল্প খুঁজে নেয়ার পক্ষে জোর দিচ্ছেন।

ফিচ সলিউশনের হেড অব এশিয়া কান্ট্রি রিস্ক রিসার্চ অন্ব্বিতা বসু বলেছেন, অনেক দেশই চায়না প্লাস ওয়ান ম্যানুফ্যাকচারিং হাব কৌশল অবলম্বন শুরু করে দিয়েছে। কিছু দেশ এরই মধ্যে চীন নির্ভরতা কমানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে। তাদের মধ্যে তাইওয়ান ও জাপান অন্যতম, যারা চীনের উৎপাদন খাতের উত্থান পর্বের শুরুতে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী ছিল।

তাইওয়ানের কর্মকর্তারা ২০১৯ সাল থেকে তাদের কোম্পানিগুলোকে চীনের বাইরে অন্য কোনো সাপ্লাই চেইন স্থাপনের জন্য উৎসাহ দিয়ে আসছে। গত বছর তারা একটি আইন পাস করে, যার অধীনে নিজ দেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে তাইওয়ানিজ কোম্পানিগুলোকে ভাড়া সহায়তা, স্বল্প ব্যয়ে মূলধন সরবরাহ, কর অবকাশ ও নির্ঝঞ্ঝাট প্রশাসনিক সেবা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেয়া হচ্ছে। এতে কাজও হচ্ছে। গত বছর তাইওয়ানের কোম্পানিগুলো নিজ দেশে ৩ হাজার ৩৫০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ করেছে অথবা বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে জাপানও একই পথে হাঁটতে শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের প্রশাসন সেসব কোম্পানির জন্য প্রায় ২২ হাজার কোটি ইয়েনের (২০০ কোটি ডলার) বাজেট বরাদ্দ রেখেছে, যারা তাদের উৎপাদন কার্যক্রম নিজে দেশে ফিরিয়ে আনবে। এছাড়া সেসব কোম্পানির জন্য ২ হাজার ৩৫০ কোটি ইয়েন সহায়তার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে জাপান সরকার, যারা তাদের উৎপাদন ব্যবস্থা চীনের বাইরে অন্য কোনো দেশে সরিয়ে নেবে।

চলতি বছরের বাকি সময়ের জন্য দক্ষিণ কোরিয়াও একই ধরনের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা সাজিয়েছে। চলতি মাসের শুরুতে সরকার জানিয়েছে, যেসব কোম্পানি নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন করবে, তাদের জন্য অপেক্ষা করছে কর প্রণোদনা, বিনিয়োগ-সম্পর্কিত নীতিমালা শিথিলীকরণ ও ব্যাপক আর্থিক সহায়তা। অবশ্য এ কার্যক্রমের জন্য কোরিয়া কী পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ রাখছে, তা তারা উল্লেখ করেনি।

অন্বিতা বসু গুরুত্বপূর্ণ একটি সত্য সামনে এনেছেন। তিনি বলেন, উৎপাদন ব্যবস্থা চীন থেকে সরানো খুব একটা সহজ হবে না। সরানো গেলেও এর গতি হবে অনেক ধীর। কারণ এখনো চীনে যে পরিমাণ পণ্য উৎপাদন হচ্ছে, তার সামান্য অংশও কয়েকটি দেশ মিলে নিতে গেলে তারা রীতিমতো হিমশিম খাবে।

বাস্তবতাও তাই বলছে। গত বছর তাইওয়ান ১ হাজার ১০০ কোটি ডলার বিদেশে বিনিয়োগ করেছে। এর ৩৮ শতাংশই গেছে চীনে। জাপানের ক্ষেত্রেও তাদের মোট বৈদেশিক বিনিয়োগের ১০ শতাংশ ঠিকই পকেটে পুরেছে চীন।

মার্কিন কোম্পানি অ্যাপলের জন্য চীনের কারখানায় আইফোন তৈরি করে তাইওয়ানের কোম্পানি ফক্সকন। কোম্পানিটির চেয়ারম্যান ইয়ং লিউ বলেছেন, মোবাইল ডিভাইসের অ্যাসেম্বলি ইউনিট যুক্তরাষ্ট্রে সরানো তাদের জন্য খুব কঠিন হবে। কারণ সেক্ষেত্রে চীনের কারখানায় যে পরিমাণ কর্মী কাজ করেন, যুক্তরাষ্ট্রেও সে পরিমাণ কর্মী জোগাড় করতে হবে। সেক্ষেত্রে ব্যয় বেড়ে যেতে পারে।

Leave A Reply

Your email address will not be published.

x