ডা. জাফরুল্লাহর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা

0 196

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট: টেলিভিশনের টকশোতে সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ সম্পর্কে অসত্য বক্তব্য দেয়ায় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হয়েছে।

গত শুক্রবার (১২ অক্টোবর) এ ব্যাপারে ক্যান্টনমেন্ট থানায় মেজর এম রাকিবুল আলম একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। ওই সাধারণ ডায়েরিটি গতকাল সোমবার (১৫ অক্টোবর) রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হিসেবে গ্রহণ করে ডিবিকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

ক্যান্টনমেন্ট থানায় দায়ের করা জিডিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘চাকুরিরত সেনাবাহিনী প্রধান সম্পর্কে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মতো একজন বিশিষ্ট ব্যক্তির এরূপ বানোয়াট, সৃজিত ও অসত্য বক্তব্য সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, যা সেনাবাহিনী প্রধানসহ সেনাবাহিনীর মতো রাষ্ট্রীয় একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে জনসম্মুখে হেয় করার হীন অপচেষ্টা।

ডা. জাফরুল্লাহর উপরোক্ত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও অসত্য বক্তব্য লাইভ টক শোতে উপস্থাপন কেবল সেনাবাহিনী প্রধান হিসেবে জেনারেল আজিজ আহমেদ-এর সামরিক সুনাম ও সামাজিক অবস্থানকে ক্ষুণ্ন করেনি, বরং তা সেনাবাহিনী প্রধানের সম্মানজনক পদকে চরমভাবে হেয় প্রতিপন্ন করেছে।

এ ধরনের বক্তব্য প্রকারান্তরে কর্মরত সেনাবাহিনীর সদস্যদের বিভ্রান্ত করেছে এবং তাদের মনোবলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এছাড়া, এরূপ অপপ্রচার সেনাবাহিনীর মতো সুশৃঙ্খল বাহিনীর সংহতি ও একতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার মাধ্যমে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রতি বিদ্বেষ ও ঘৃণা সৃষ্টি করে সরকারকে অস্থিতিশীল করার নিমিত্তে সেনাবাহিনীর সদস্যদের বিভ্রান্ত করেছে এবং তাদের মনোবলের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।’

বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ‘সময় টেলিভিশনে’ এক টকশো’তে সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ সম্পর্কে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর করা বিতর্কিত মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানায় দায়ের করা সাধারণ ডায়েরিতে (জিডি) এমন অভিযোগ করা হয়েছে।

সেনা সদরের মেজর এম রকিবুল আলম (বিএ৮০০৬) বাদী হয়ে শুক্রবার এই জিডি দায়ের করেন। জিডির নম্বর-৪৯৮। প্রাথমিকভাবে জিডির তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলেন ক্যান্টনমেন্ট থানার পরিদর্শক (তদন্ত) কবির হোসেন হাওলাদার। রবিবার জিডিটি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উত্তর বিভাগকে।

ঢাকা মেট্টোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার আব্দুল বাতেন গতকাল রাতে বাসসকে বলেন, গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) ফজলুর রহমানকে রাষ্ট্রদ্রোহের এই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নিযুক্ত করা হয়েছে।

এদিকে গতকাল সোমবার আশুলিয়া থানায় ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর বিরুদ্ধে জমি দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগে আরেকটি মামলা হয়েছে।

জিডিতে বলা হয়, ডিএমপি ঢাকার শাহবাগ থানার অধীনস্থ ৮৯ নম্বর বীর উত্তম সি আর দত্ত রোডে অবস্থিত বেসরকারি টিভি চ্যানেল সময় টেলিভিশনে গত ৯ অক্টোবর রাত আনুমানিক ১০টা ২০ মিনিটে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বক্তব্য রাখেন।

এ সময় তিনি বলেন, ‘দেখেন, এটা একটা ছোট দেশ, আমরা একে-অপরকে চিনি। তবে অনেকগুলো তাদের বিরুদ্ধে পার্শ্ব সারকামস্টেনশিয়াল এভিডেন্স যে, আর্জেস গ্রেনেড কোত্থেকে এসেছে? দেখেন, আর্জেস গ্রেনেড, আমি জানি না, সময়টি মিলে কিনা, আমাদের বর্তমান চিফ অব আর্মি আজিজ সাহেব চট্টগ্রামের কমান্ড্যান্ট ছিলেন, জিওসি ছিলেন, কমান্ড্যান্ট ছিলেন। তার ওখান থেকে একটা ব্যাপকসংখ্যক সমরাস্ত্র, গোলাগুলি চুরি হয়ে গেছিল, হারিয়ে গেছিল, বিক্রি হয়ে গেছিল এবং এজন্য একটা কোর্ট মার্শালও হয়েছিল আজিজের নামে, জেনারেল আজিজের নামে কোর্ট মার্শালও হয়েছিল। আজকে উনি, কিন্তু উনার কেন এসেছে, উনি হলেন ওভারঅল, উনি নিশ্চয়ই এখন তো ওখান থেকে এবং আমরা আরও দেখছি মিরপুরে সমপ্রতি কয়েক বাক্স পুকুরের মধ্যে পাওয়া গেছে, এ সবগুলি আমাদের ব্যর্থতা।’

জিডিতে বাদী উল্লেখ করেন, ‘বর্তমান সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ সম্পর্কে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর বক্তব্যটি ছিল একটি দায়িত্বজ্ঞানহীন, অসত্য বক্তব্য। কারণ, বর্তমান সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ চাকরি জীবনে কখনোই চট্টগ্রামে জিওসি বা কমান্ড্যান্ট হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন না। তিনি ২০১০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১১ সালের জুন পর্যন্ত কুমিল্লায় ৩৩ আর্টিলারি ব্রিগেডের ব্রিগেড কমান্ডার, ২০১১ সালের জুন থেকে মে, ২০১২ পর্যন্ত ঢাকার মিরপুরে ৬ স্বতন্ত্র এডিএ ব্রিগেডের ব্রিগেড কমান্ডার এবং মে ২০১২ থেকে ২০১২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত কুমিল্লায় ৩৩ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময়ে চট্টগ্রাম বা কুমিল্লা সেনানিবাসে কোনো সমরাস্ত্র বা গোলাবারুদ চুরি বা হারানোর কোনো ঘটনা ঘটেনি। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, বর্তমান সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ তাঁর সুদীর্ঘ বর্ণাঢ্য সামরিক চাকরি জীবনে কখনোই কোর্ট মার্শালের সম্মুখীন হননি। পরবর্তী সময়ে আমি অবগত হই যে, ২০০৩-২০১৮ পর্যন্ত চট্টগ্রামের ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি হিসেবে যথাক্রমে মেজর জেনারেল মঈন ইউ আহমেদ (পরবর্তীতে সেনাবাহিনী প্রধান), মেজর জেনারেল ইকবাল করিম ভুঁইয়া (পরবর্তীতে সেনাবাহিনী প্রধান), মেজর জেনারেল সিনা ইবনে জামালী (পরবর্তীতে লে. জেনারেল), মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আব্দুল মুবীন (পরবর্তীতে সেনাবাহিনী প্রধান), মেজর জেনারেল মোহাম্মদ শামিম চৌধুরী, মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আসহাব উদ্দিন, মেজর জেনারেল মো. সফিকুর রহমান (পরবর্তীতে লে. জেনারেল), মেজর জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর কবির তালুকদার কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে মেজর জেনারেল এস এম মতিউর রহমান জিওসি হিসেবে কর্মরত আছেন।’

জিডিতে বলা হয়, ‘উক্ত অনুষ্ঠানটি সমপ্রচারকালে আমি নিম্নস্বাক্ষরকারী ক্যান্টনমেন্ট থানাধীন সেনাবাহিনীর সেনা সদর অফিসার্স মেসের টিভি রুমে একাকী বসে উল্লেখিত অনুষ্ঠানটি দেখছিলাম। অনুষ্ঠান চলাকালে বক্তা জনাব ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মুখে উপরে উল্লেখিত বক্তব্য শুনে আমি বেশ অবাক ও হতভম্ভ হয়ে যাই এবং আমার মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। কারণ, যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক হিসেবে গণ্য, সেই বাহিনীর প্রধান সম্পর্কে এরূপ বক্তব্য আমার মতো সেনাবাহিনীর অন্য সদস্যদের মধ্যেও অনুরূপ হতাশা ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করাই স্বাভাবিক। অনুষ্ঠান শেষে আমি বিষয়টি নিয়ে আমার কিছু সহকর্মীর সঙ্গে আলোচনা করি। কারণ, আমার জানা মতে, বর্তমান সেনাবাহিনী প্রধান কখনো চট্টগ্রামের জিওসি এবং কমান্ড্যান্ট ছিলেন না এবং তার কোনও কোর্ট মার্শালও হয়নি। পরবর্তী দিনও আমি অফিসে যাওয়ার পর সহকর্মীদের এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করি। তখন নিশ্চিত হই যে সেনাপ্রধান সম্পর্কে ডা. জাফরুল্লাহর বক্তব্য আদৌ সত্য ছিল না। এখানে উল্লেখ্য যে অনুষ্ঠান পরবর্তী সময়ে ও পরদিন সেনাবাহিনীর বাইরে থেকেও অনেকে বিষয়টি আমার কাছে জানতে চায়। সহকর্মী ও বাইরের লোকদের সঙ্গে আলোচনাকালে আমি নিশ্চিত হই যে যারা অনুষ্ঠানটি দেখেছেন তাদের বেশিরভাগ লোকই ডা. জাফরুল্লাহর বক্তব্যে সেনাবাহিনী সম্পর্কে হতাশা ব্যক্ত করেন এবং তাদের সকলের মধ্যে একটি অনিশ্চয়তা কাজ করে। অতঃপর প্রচারিত এই বক্তব্যের বিষয়ে আমি আমার সহকর্মীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে জানতে পারি যে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর এহেন বক্তব্য সময় টেলিভিশনের মতো একটি বহুল প্রচারিত ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় সরাসরি সমপ্রচারের ফলে দেশ-বিদেশের অগণিত দর্শক-শ্রোতা তা দেখেছেন এবং শুনেছেন। সেনাবাহিনীর মতো সুশৃঙ্খল ও দেশপ্রেমিক একটি বাহিনীপ্রধান তথা সেনাপ্রধানের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার যাচাই-বাছাই না করে উক্ত টিভি টকশোতে এ ধরনের একটি উদ্দেশ্যমূলক ও মিথ্যা বক্তব্যের কারণে সেনাবাহিনীর সুনাম ও ভাবমূর্তি জনগণের নিকট মারা্তকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে।’

জিডিতে আরও বলা হয়, ‘এরূপ অপপ্রচার সেনাবাহিনীর মতো সুশৃঙ্খল বাহিনীর সংহতি ও একতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। ডা. জাফরুল্লাহ তার বক্তব্য প্রদানের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর ঐক্যকে বিনষ্ট করাসহ সাধারণ জনগণের মধ্যেও বিভ্রান্তিকর তথ্য ও উদ্দেশ্যমূলক গুজব ছড়িয়ে দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী ও সাধারণ জনগণের মধ্যে সেনাবাহিনী সম্পর্কে বিরূপ ও নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করে দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন বলে প্রতীয়মান।’

জিডিতে বলা হয়, ‘সেনাবাহিনী স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক। সময় টিভিতে বিগত ৯ অক্টোবর সম্পাদকীয় নামের টকশোতে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ মামলার রায়ের পূর্বরাতে হঠাত্ অপ্রাসঙ্গিকভাবে সেনাপ্রধান সম্পর্কে প্রদত্ত বক্তব্যটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, বিদ্বেষ প্রসূত ও ষড়যন্ত্রমূলক, যা সেনাবাহিনীর মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি, তথা রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মতো একজন উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি কেন, কি উদ্দেশ্যে এবং কাদের প্ররোচনায় এ ধরনের উদ্দেশ্যমূলক, বানোয়াট ও অসত্য বক্তব্য টকশোতে বলেছেন তা তদন্তের দাবি রাখে। উল্লেখিত ঘটনার বিষয়ে সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা ও নির্দেশক্রমে অভিযোগটি দায়ের করতে কিছুটা বিলম্ব হলো।

ক্যান্টনমেন্ট থানার অফিসার ইনচার্জ বরাবরে দায়ের করা জিডিতে আরও বলা হয়, ‘অতএব উল্লেখিত ঘটনাবলি বিধিমোতাবেক তদন্ত করে উপরে উল্লেখিত ডা. জাফরুল্লাহসহ উক্ত ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে আপনাকে বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো।’

আশুলিয়া থানায় আরেকটি মামলা : ডা. জাফরুল্লাহর বিরুদ্ধে আশুলিয়া থানায় আরেকটি মামলা হয়েছে। মামলাটি করেছেন মোহাম্মদ আলী নামের এক ব্যক্তি। মামলায় তিনি অভিযোগ করেছেন, আশুলিয়ার পাথালিয়ায় তাদের কয়েকজনের ৪ একর ২৪ শতাংশ জমি রয়েছে। সেই জমি গণস্বাস্থ্যের ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, দেলোয়ার হোসেন, সাইফুল ইসলাম শিশির ও আওলাদ হোসেনসহ অজ্ঞাতনামা ৩/৪ জন মিলে এই জমিটি দীর্ঘদিন ধরে দখলের চেষ্টা করে আসছিলেন। এই জমিতে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে মালিকরা গাছ লাগিয়ে রেখেছেন। গত রবিবার ডা. জাফরুল্লাহর নির্দেশে অপর আসামিরা জমিতে হাজির হয়ে জমিটি তাদের নামে লিখে দিতে বলেন। না দিলে এক কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেন। পরে তারা গেইটসহ কিছু জিনিসপত্র ভাঙচুর করে। যার মূল্য ৫ লাখ টাকার মতো।

বিডি সংবাদ টোয়েন্টিফোর ডটকম/

Leave A Reply

Your email address will not be published.

x