‘দুর্নীতির প্রশাসনের ওপর নির্ভর করে দেশ চলছে’

0 15

বিডি সংবাদ টোয়েন্টিফোর ডটকম: বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক বাম নেতা সাজ্জাদ জহির চন্দন বলেছেন, ‘দে‌শে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট হয়ে যাচ্ছে। বড় বড় লুটপাটকারীদের স্বার্থে আজকে পাটকলগুলো বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। একটি অনির্বাচিত দুর্নীতির প্রশাসনের ওপর নির্ভর করে দেশ পরিচালনা হচ্ছে।’

বৃহস্পতিবার (০২ জুলাই)  জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বাম গণতান্ত্রিক জোট আয়োজিত এক বিক্ষোভ সমাবেশে তিনি এ কথা বলেন।

সাজ্জাদ জহির চন্দন বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি দেখে মনে হয় দেশে কোনও সরকার নাই। একনায়কতন্ত্র ও এক ব্যক্তির কথায় দেশ পরিচালিত হচ্ছে। সরকারের জনগণের প্রতি কোনও দায়বদ্ধতা নেই। এই করোনও পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যব্যবস্থা দুর্দশার মধ্যে পড়েছে। আমাদের সরকার পর্যাপ্ত সময় পেয়েছিল, কোনও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে নাই। ডিসেম্বর মাসে চীনের উহান প্রদেশে এই ভাইরাস সংক্রমিত হলো। তখন আমাদের সরকারের পক্ষ থেকে কর্ণপাত করা হলো না।’

স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি ও অনিয়মের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘যখন করোনা বাংলাদেশে ভয়াবহতা ধারণ করল, তখন স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চিত্র আমাদের সামনে ফুটে উঠল। এই করোনা পরিস্থিতির মধ্যেও স্বাস্থ্য বিভাগের দুর্নীতি-অনিয়ম অব্যাহত রয়েছে। একটি ওয়েবসাইট তৈরি করতে ১০ কোটি টাকা বিল করা হয়েছে। নিম্নমানের পিপিই ও মাস্ক সরবরাহ করার ফলে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা করোনায় সংক্রমিত হয়। পার্লামেন্টের স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছেন- ‘চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা সঠিকভাবে মাস্ক ও পিপিই না পরার কারণে ভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছে’।’ব্রেকিংনিউজ

‘স্বাস্থ্য অধিদফতরে কোটি কোটি টাকা দুর্নীতি হয়েছে কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলো না। স্বাস্থ্য সচিবকে সরিয়ে আরেকটি মন্ত্রণালয় সচিব করা হলো’- যোগ করেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘গত কয়েকদিন ধরে শুনছি  ঢাকা মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী  কর্মীদের খাওয়ার খরচ হয়েছে নাকি ২০ কোটি টাকা। মঙ্গলবার ঢাকা মেডিকেল কলেজের পরিচালক বলেছেন খরচ হয়েছে নাকি ২৬ কোটি টাকা। একটি ডিমের দাম ধরা হয়েছে এক হাজার টাকা। আর একটি কলার দাম ধরা হয়েছে দুই হাজার টাকা। হরিলুট কাকে বলে? হাজার হাজার কোটি টাকা লুট হয়ে যাচ্ছে। বড় বড় লুটপাটকারীদের স্বার্থে আজকে পাটকলগুলো বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। ২৫ হাজার নিয়মিত শ্রমিক আছে। পাটকলগুলোর সাথে পাট চাষীদের ভাগ্য জড়িত হয়ে আছে। আজকে তারা পাটকলগুলো বন্ধ করার জন্য গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের ব্যবস্থা করছে। বরাদ্দ করেছে ৬ হাজার কোটি টাকার। আমাদের দেশের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন ১২’শ কোটি টাকা খরচ করলে পাটকলগুলো আধুনিক করা যাবে। পাটকলগুলো আধুনিক করা গেলে সেই টাকা দিয়ে শ্রমিকদের বেতন দেয়া সম্ভব। শ্রমিক ছাঁটাই ও পাটকল বন্ধ করার কোনও প্রয়োজন হয় না।’

বাম গণতান্ত্রিক জোটের সমন্বয়ক বাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় পাটকল গুলো বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তারা কি করবে সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো বক্তব্য নাই। একবার বলে বন্ধ করবে। আরেকবার বলে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপে (পিপিপি) তারা পরিচালনা করবে। আরেকবার বলবে, বিকল্প আরেকটা পরিচালনা পদ্ধতির মাধ্যমে পাটকলগুলো চালাবে। তার আগে এখানে যেসব শ্রমিক আছে তাদের পাওনা দিয়ে তাদেরকে বিদায় করে দিবে। শ্রমিকদের ছাঁটাই করা হবে। চাকরিচ্যুত করা হবে। আমরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।’

পটলের ইতিহাস উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসের সাথে পাটকলের ইতিহাস সংযুক্ত। স্বাধীনতার আগে বাংলাদেশ ৭৭টি পাটকল ছিল। ১৯৮১ সালে ৮২ পাটকল বাংলাদেশ জুটমিল করপোরেশনের আওতায় আসে। বিশ্ব ব্যাংক ও আইএমএফ দ্বারা ১৯৮২ সালের ঘোষণা দিল সারাবিশ্বে উদারনীতিবাদের কৌশল হিসেবে বাংলাদেশের কাঠামোগত সমন্বয়ের কথা বলল তারা। তারা বাংলাদেশের পাটকলকে বন্ধ করতে বলল। আর ভারতকে পাট খাতে উন্নয়ন করতে বলল। আমাদেরকে ২৫ কোটি ডলার দিল আর ভারত কেও ২৫ কোটি ডলার দিল। আমাদেরকে বলা হলো পাটকল বন্ধ করে দিতে আর ভারতকে বলা হলো নতুন নতুন পাটকল তৈরি করতে। এই বিশ্ব ব্যাংক ও আইএমএফ সম্রাজ্যবাদের পরামর্শে নতজানু সরকার গুলো দেশে একের পর এক পাটকল বন্ধ করতে শুরু করে।’

তিনি বলেন, ‘২০০২ সালে বিএনপি-জামাত জোট সরকার আদমজী পাটকল বন্ধ করে দিয়েছিল। এশিয়ার বৃহত্তম পাটকল আদমজীতে ৪০ হাজার শ্রমিক একসাথে কাজ করতো। সেই পাটকল বন্ধ করে দেওয়ার সময়ের  চারদলীয় জোটের মন্ত্রী মতিউর রহমান নিজামী তৎকালীন জামাতের আমির, যুদ্ধপরাধী বলেছিল, অজগর বাংলাদেশের অর্থনীতিতে খেয়ে ফেলছে। আদমজী পাটকল এর উপর তাদের একটা ক্ষোভ ছিল। তারা ছিল স্বাধীনতা বিরোধী।’

সাজ্জাদ জহির চন্দন বলেন, ‘আদমজী জুট মিলের ইতিহাস সাথে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস জড়িয়ে আছে। ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে আদমজী পাটকলের হাজার হাজার শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে আসে ঢাকা শহর অবরোধ করে গণঅভ্যুত্থান সফল করেছিল। মুক্তিযুদ্ধে শ্রমিকদের বড় ভূমিকা ছিল। কাজেই সেই পরাজয়ের জালা মিটাতে আদমজী পাটকল বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু এখন আমরা দেখছি যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে। সেই আওয়ামী লীগ সরকারের পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী তিনি অবশিষ্ট ২৫ টি পাটকল ধ্বংস করার চক্রান্ত করছেন। রাজাকার আর মুক্তিযোদ্ধা আজ একাকার হয়ে গেছে। তাদের সবার লক্ষ্য বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটেপুটে খাওয়ার। এই লুটেপুটে খাওয়ায় রাজাকার আর মুক্তিযুদ্ধের এখন কোন ভেদাভেদ নেই।’

বিক্ষোভ সমাবেশ শেষে রাষ্ট্রীয় পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্ত, পাটকল আধুনিকায়ন করা, একাধিকবার জ্বালানির দাম বৃদ্ধি বিল প্রত্যাহার, স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি-লুটপাট বন্ধ, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত ও বিনামূল্যে সকল নাগরিকের করোনা পরীক্ষা ও চিকিৎসার দাবিগুলো নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ঘেরাওয়ের লক্ষ্যে মিছিল নিয়ে বের হয় বাম গণতান্ত্রিক জোটের নেতাকর্মীরা।

Leave A Reply

Your email address will not be published.