পাল বংশের ইতিহাস

0 1,249

পাল বংশ আট শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে প্রায় চারশত বছর বাংলা ও বিহারে শাসনকারী রাজবংশ। গোপাল প্রতিষ্ঠিত এ বংশের শাসন চলে নানা ধরনের উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে আঠারো পুরুষ ধরে।

ধর্মপাল এবং দেবপাল এর শাসনকাল ছিল বংশের উদীয়মান প্রতিপত্তির যুগ। এ সময়ই বাংলা ও বিহারে এ বংশের শাসন দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এ যুগের পাল রাজারা নিজেদেরকে উত্তর ভারতীয় রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী হিসেবে গণ্য করেন। ধর্মপাল এবং দেবপাল উভয়েই উত্তর ভারতীয় সাম্রাজ্যের মধ্যদেশ (কনৌজ) অধিকার করার জন্য তৎকালীন অপর দুটি শক্তি পশ্চিম ভারতের গুর্জর-প্রতিহার এবং দাক্ষিণাত্যের রাষ্ট্রকূটদের সঙ্গে এক দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামে জড়িয়ে পড়েন।

কিছু সময়ের জন্য তাঁরা সফলও হন। ধর্মপাল কনৌজের সিংহাসনে তাঁর অনুগ্রহভাজন ব্যক্তিকে স্থাপনে সফল হয়েছিলেন। দেবপালও প্রতীহারদের বিরুদ্ধে নিজের অস্তিত্ব অক্ষুণ্ণ রাখতে সক্ষম হন। প্রশংসামূলক শ্লেলাকেপূর্ণ পাল দলিলপত্রে ধর্মপাল এবং দেবপালকে বিখ্যাত বিজেতা হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। এভাবে বাংলা উত্তর ভারতীয় রাজনীতিতে একটি পরাক্রান্ত শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়।

দেবপালের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে উদীয়মান প্রতিপত্তির যুগের অবসান ঘটে এবং শুরু হয় স্থবিরতার যুগ। প্রথম মহীপাল কর্তৃক সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধার পর্যন্ত স্থবিরতার যুগ চলতে থাকে। এ স্থবিরতা ধীরে ধীরে পাল সাম্রাজ্যকে বিশৃঙ্খলা ও অবনতির দিকে টেনে নিয়ে যায়। খুব সম্ভবত দেবপালের শাসনকালের পর উত্তরাধিকার সংক্রান্ত সমস্যা থেকেই এ স্থবিরতা এবং অবনতি এসেছিল। দেবপালের পর পাল সিংহাসনে কে আরোহণ করেছিলেন এ নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। পাল দলিলপত্রে দেবপালের পুত্র ও উত্তরাধিকারী হিসেবে তিনজন রাজার নাম জানা যায়। এঁরা হলেন বাদল স্তম্ভলিপিতে উল্লিখিত দেবপাল ও নারায়ণপালের মধ্যবর্তী অবস্থানে শূরপাল, নারায়ণপালের ভাগলপুর তাম্রশাসনে উল্লিখিত বিগ্রহপাল এবং সম্প্রতি আবিষ্কৃত জগজ্জীবনপুর তাম্রশাসনে উল্লিখিত মহেন্দ্রপাল।

বাদল স্তম্ভলিপিতে শূরপাল ও দেবপাল অথবা শূরপাল ও নারায়ণপালের মধ্যকার সম্পর্ক বিষয়ে কোন ধরনের নির্দেশনা নেই। বিগ্রহপাল ছিলেন জয়পালের পুত্র এবং ধর্মপালের ভাই বাকপালের পৌত্র। বিগ্রহপালের পরে পাল সাম্রাজ্য শাসনকারী সকল রাজাই ছিলেন ধর্মপালের ভাই বাকপালের বংশধর।

সুতরাং দেবপালের পর প্রায় একই সময়ে শাসনকারী তিনজন রাজার নামের অস্তিত্ব পাল বংশের অভ্যন্তরীণ সংকটেরই ইঙ্গিত দেয়। দেবপালের পর সম্ভবত মহেন্দ্রপালই পাল সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। কিন্তু সিংহাসনের অপর দুজন দাবিদার শূরপাল এবং বিগ্রহপাল সাম্রাজ্যের ভিতরেই সম্ভবত বিপুল প্রয়াস দ্বারা নিজেদের স্বাধীন অবস্থান অর্জন করেন। শেষ পর্যন্ত পাল বংশের শাসন সরাসরিভাবে বিগ্রহপালের বংশধরদের হাতে চলে যায়।

Palbansha.jpg

উত্তরাধিকার সংকট থেকে উদ্ভূত স্থবিরতা পাঁচজন রাজার শাসনকালব্যাপী একশ’ বছরেরও অধিককাল অব্যাহত থাকে। এ সময়ে পাল রাজাদের শৌর্য-বীর্য এবং শক্তি হ্রাস পায়, সাম্রাজ্য সম্প্রসারণের আদৌ কোন চেষ্টা করা তো হয়ই নি বরং বহিঃশত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করা (দশ শতকের শেষ দিকে চন্দেল এবং কলচুরিদের) অথবা অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ দমন করার মতো যথেষ্ট শক্তিও পাল রাজাদের ছিল না।

দশ শতকের মাঝামাঝিতে পশ্চিম ও উত্তর বাংলার অংশ বিশেষে কম্বোজ গৌড়পতি গণ নিজেদের স্বাধীন অবস্থান অর্জন করেন এবং এখানে তাদের তিন পুরুষ (রাজ্যপাল, নারায়ণপাল এবং নয়পাল) শাসন পরিচালনা করেন। কিছু সময়ের জন্য পাল সাম্রাজ্য বিহারের অংশ বিশেষে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

প্রথম মহীপালএর শাসনকালে পালদের শৌর্য-বীর্য ও জীবনীশক্তি অনেকটা ফিরে আসে এবং পাল সাম্রাজ্যে দ্বিতীয়বারের মতো প্রাণশক্তি সঞ্চারিত হয়। উত্তর এবং পশ্চিম বাংলার হূতরাজ্য পুনরুদ্ধার এবং পাল বংশের শাসন দৃঢ় ভিত্তির উপর পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার মাধ্যমে প্রথম মহীপাল সাফল্য অর্জন করেন। সম্ভবত জনহিতকর কার্যাবলির মাধ্যমেই প্রথম মহীপাল ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। দীর্ঘদিন পর্যন্ত অসংখ্য লোকগাঁথা ও প্রাচীন গল্প কাহিনীতে তাঁর নাম টিকে ছিল।

তাঁর চার উত্তরাধিকারীর শাসনকালে (প্রায় ৪০ বছর), অর্থাৎ  রামপালএর সময় পর্যন্ত পাল সাম্রাজ্যের গৌরব সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। পাল শাসনের দুর্বলতা সুস্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয় দ্বিতীয় মহীপালের রাজত্বকালেই। এ সময় সামন্তদের বিদ্রোহ (বরেন্দ্র বিদ্রোহ) সংঘটিত হয় এবং উত্তর বাংলায় কৈবর্ত প্রধান দিব্যর স্বাধীন শাসন প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

দীর্ঘ ৪০ বছরের রাজত্বকালে রামপাল উত্তর বাংলা পুনরুদ্ধার এবং উড়িষ্যা, কামরূপ ও উত্তর ভারতের মধ্যদেশে সাম্রাজ্য সম্প্রসারণের মাধ্যমে পাল সাম্রাজ্যের গৌরবময় অবস্থান ফিরিয়ে আনেন। নয়পাল এবং তৃতীয় বিগ্রহপালের সময় হতে বিদ্যমান কোন্দল-কলহ সাময়িকভাবে নিবৃত্ত করতে তিনি সক্ষম হন। তিনি ক্ষয়িষ্ণু পাল সাম্রাজ্যকে নবজীবন দান করেন। কিন্তু এই সাফল্য ছিল ক্ষণস্থায়ী এবং তাঁর উত্তরাধিকারিগণ এতই দুর্বল ছিলেন যে সাম্রাজ্যের ক্রমাগত পতন রোধে তাঁরা ব্যর্থ হন। খুব সম্ভবত রামপালের সমসাময়িককালে অথবা তাঁর উত্তরসূরি কুমারপালের সময়ে দক্ষিণ রাঢ়ে স্বাধীন শক্তি হিসেবে সেনদের অস্তিত্ব ছিল।

শেষ পাল রাজা হিসেবে পরিচিত মদন পালের রাজত্বের ৮ম বছরের কিছু পরে সেনদের হাতে উত্তর বাংলার পতন ঘটে এবং তাঁর শাসনের শেষ বছরগুলি বিহারের ক্ষুদ্র অংশে সীমাবদ্ধ ছিল। বিহার হতে আবিষ্কৃত শিলালিপিতে ওই অঞ্চলের একটি অতি ক্ষুদ্র অংশে সাম্রাজ্যবাদী পালদের উত্তরসূরি হিসেবে দুজন পাল রাজার নাম পাওয়া যায়। তাঁরা হলেন গোবিন্দপাল ও পলপাল। কিন্তু পাল বংশের সঙ্গে তাদের কোন প্রকার সম্পর্ক এখন পর্যন্ত প্রমাণিত হয় নি।

বিডি সংবাদ টোয়েন্টিফোর ডটকম/

Leave A Reply

Your email address will not be published.