বগুড়ায় মানবিক সহায়তা পাচ্ছে ৭৫ হাজার পরিবার

0 18

দীপক সরকার, বগুড়া প্রতিনিধিঃ বিশ্বব্যাপী করোনা ভাইরাসের নিরব তান্ডব চলছে। বিশ্বর অন্যান্যদের মত বাংলাদেশেও করোনা ভাইরাসের যাত্রা শুরু হয় ৮ মার্চ থেকে। আর এ প্রাণঘাতী ভাইরাস মোকাবিল করতে সরকার দেশব্যাপী সাধারণ ছুটি, লকডাউন ও স্বাস্থ্য সচেতনতামুলক পরামর্শ প্রদান করেন ২৫ মার্চ থেকে। দীর্ঘদিন ধরে মানুষ গৃহবন্দি হওয়ার কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের পক্ষ থেকে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ অব্যাহত রাখার পাশাপাশি এ পর্বে বগুড়া জেলায় মানবিক সহায়তা পাচ্ছে ৭৫ হাজার কর্মহীন পরিবার।
ইতোমধ্যে শহর ও গ্রামের মানবিক সহায়তার উপকারভোগীদের ডাটাবেজ তৈরী করেছে ত্রান ও পুর্নবাসন মন্ত্রণালয়ের অধীনে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের সহায়তায় এই তালিকায় সহায়তা পাবে করোনার কারণে কর্মহীন, অসহায়, দুস্থ মানুষেরা। শুরুতে তাদের প্রতিমাসে ২০কেজি করে চাল দেবার কথা থাকলেও দেয়া হতে পারে নগদ টাকা। সরকারি উচ্চ পর্যায় থেকে প্রত্যেককে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকা প্রতিমাসে দেয়ার প্রস্তাবনা রয়েছে। এজন্য উপকারভোগীদের মোবাইল নম্বরে মোবাইল ব্যাংকিং এর হিসাব চালু করে সরাসরি টাকা পাঠানোর চিন্তাভাবনা চলছে।
বগুড়া জেলা ত্রাণ ও পুর্নবাসন কর্মকর্তা আজাহার আলী মন্ডল জানিয়েছেন, জেলার ১২টি উপজেলার ১০৮টি ইউনিয়নে ৪৯ হাজার ৪৩৮টি পরিবার এবং ১২টি পৌরসভায় ২৫ হাজার ৫৬২টি পরিবারকে সিএএমএস (সেন্ট্রাল এইড ম্যানেজমেন্ট সিষ্টেম) এই ডাটাবেজের আওতায় আনা হচ্ছে। তারা এই মাস থেকেই সরকারি অনুদান পাবেন।
জেলা ত্রাণ ও পুর্নবাসন অফিস সুত্রে জানা গেছে, বগুড়া জেলার ১২টি উপজেলার মধ্যে এ তালিকায় বগুড়া সদরের ৩৭২২ পরিবার, শিবগঞ্জের ৫৫০৪ পরিবার, শেরপুরের ৫০১০ পরিবার, গাবতলীর ৪৮৫৪ পরিবার, ধুনটের ৪৮৩৬ পরিবার, সারিয়াকান্দির ৪৬০০ পরিবার, শাজাহানপুরের ৪২৫৫ পরিবার, কাহালুর ৩৭১৪ পরিবার, সোনাতলার ৩৪৫৫ পরিবার, আদমদিঘীর ৩২৭৬ পরিবার, নন্দীগ্রামের ৩২৫৫ পরিবার ও দুপচাচিয়ার ২৯৫৭টি পরিবার রয়েছে।
এছাড়া পৌরসভার মধ্যে বগুড়ায় পৌরসভায় সর্বোচ্চ ৫৮৮৭ পরিবার, শেরপুর পৌরসভায় ১৮৯৫টি পরিবার, ধুনট পৌরসভায় ১৯২৬টি পরিবার, সারিয়াকান্দিতে ২০২৪টি পরিবার, সোনাতলা পৌরসভায় ১৯৪০টি পরিবার, সান্তাহারে ১৮০৮টি পরিবার, শিবগঞ্জ পৌরসভায় ১৮০৫টি পরিবার, গাবতলী পৌরসভায় ১৮০৩টি পরিবার, নন্দীগ্রাম পৌরসভায় ১৬৭০টি পরিবার, দুপচাঁচিয়া পৌরসভায় ১৬৬২টি পরিবার, তালোড়া পৌরসভায় ১৫৭৪টি পরিবার ও কাহালু পৌরসভায় ১৫৬৮টি পরিবার রয়েছে। এদের পরিবার ভিত্তিক মানবিক সহায়তা কার্ডের জন্য আবেদন ফরমের ১২টি তথ্য পুরণ করা হয়েছে। যাতে তারা অন্যকোন সামাজিক সহায়তা পান কিনা সে তথ্যও লিপিবদ্ধ করা থাকবে।
এ প্রসঙ্গে বগুড়া সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) রিয়াজুল ইসলাম রিয়াজ জানান, উপজেলায় ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যের মাধ্যমে উপকারভোগীদের তালিকা ও তথ্য আপলোড করা শেষে হয়েছে। তবে তাদেরকে কিভাবে মানবিক সহায়তা দেয়া হবে সে বিষয়ে সুস্পষ্ট কোন নিদের্শনা এখনো আসেনি। তবে প্রত্যেকের নামের সাথে জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, ঠিকানা ও ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বর দেয়া হয়েছে। সরাসরি টাকা দেয়া হলে তা এই মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মধ্যেমেও দেয়া হতে পারে।
এ বিষয়ে শেরপুর উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. মমিনুর রহমান জানান, আমরা দুযোর্গ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের নিদের্শনামত স্থানীয়ভাবে করোনার কারণে অভাবগ্রস্থ পরিবার প্রধানের নামের তালিকা সফটওয়ারের মাধ্যমে পাঠিয়েছি। এই তালিকায় পুরুষের পাশাপাশি কিছু নারীও রয়েছে। তবে অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তার সুফলভোগী যেমন, ভিজিডি, ভিজিএফ, বয়স্কভাতা, বিধবা ভাতাভোগীদের এই তালিকায় নাম দেয়া হয়নি।
অন্যদিকে বগুড়ার জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সুত্রে জানা গেছে, করোনা প্রাদূর্ভাবে জেলার কর্মহীন মানুষদের জন্য বিনামূল্যে বিতরণের জন্য ৮ মে পর্যন্ত বরাদ্দ ২১৬৮.৫০০ মেট্রিক টন চালের মাঝে ২১৪৮.২০০ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। মজুদ রয়েছে ২০.৩০০ মেট্রিক টন চাল। ১০ টাকা কেজির ৮৭.০০ মেট্রিক টন চালের মধ্যে ৭২.০০ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। মজুদ রয়েছে ১৫ মেট্রিক টন চাল। নগদ ১ কোটি ৩১ লক্ষ ৩০ হাজার টাকার মধ্যে ১ কোটি ২৭ লক্ষ ১৪ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়েছে। মজুদ রয়েছে ৪ লক্ষ ১৬ হাজার টাকা। এতে উপকারভোগীর সংখ্যা ৩ লাখ ৭৯ হাজার ৮১১জন। এছাড়া জিআর (ক্যাশ) ১ কোটি ৪লাখ ৩০হাজার টাকার মধ্যে ১ কোটি ১৪ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়েছে। শিশুখাদ্যের জন্য ২৭ লাখ টাকার খাদ্য ৭৪৬০টি পরিবারের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, করোনা ভাইরাস সংক্রমণের কারনে গত ২৫ মার্চ থেকে সারাদেশে সাধারণ ছুটি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণপরিবহন ও দোকানপাট বন্ধ হওয়ায় কর্মহীন হয়ে পড়ে বগুড়া জেলার প্রায় ৪লাখ মানুষ। এর মধ্যে রয়েছে পরিবহন শ্রমিক, হোটেল শ্রমিক, সেলুন শ্রমিক, চা-বিক্রেতা, মুচি, ধোপা, স্বর্ণ কারিগর, দর্জি শ্রমিকসহ নানা শ্রেণি পেশার মানুষ। ফলে কর্মহীন নি¤œবিত্ত, হতদরিদ্র এসব মানুষের জীবনে শুরু হয়েছে টানাপোড়েন। অবশ্য সরকারের পাশাপাশি কর্মহীন অসহায়দের পাশে দাঁড়িয়েছে বিভিন্ন বিত্তবান ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান।
গত ২১ এপ্রিল বগুড়ায় প্রথম করোনারোগী সনাক্ত হয়েছে। সেদিন থেকেই পুরো বগুড়া জেলা লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। এ পর্যন্ত জেলায় চিকিৎসক, নার্স, পুলিশ সহ ৩৪ জন করোনারোগী শনাক্ত হয়েছে। ৬ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। এ ছাড়াও বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে স্থাপিত পিসিআর ল্যাবে প্রতিনিয়ত করোনা সনাক্তকরণে নমুনা সংগ্রহ করছে সংশ্লিষ্টরা জেলা সিভিল সার্জন গওসুল আজিম চৌধুরী জানিয়েছেন।

Leave A Reply

Your email address will not be published.