বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে ৩০ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ চলমান ॥ বগুড়ার শেরপুর পৌরসভার রাস্তাগুলো ময়লা আবর্জনার ভাগাড় ! নাগরিক সেবা বিঘ্নিত

249

বগুড়া প্রতিনিধি : বগুড়ার শেরপুর পৌর শহরে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে পৌর কিচেন মার্কেট সহ প্রায় ৩০ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। অপরদিকে ৩২ জন পরিচ্ছন্ন কর্মি থাকা সত্বেও শহরের প্রতিটি রাস্তায় ময়লা আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হওয়ায় মানুষের দুর্ভোগ সৃষ্টি করছে। ঢাকা-বগুড়া মহাসড়ক থেকে কলেজ রোডের পুর্ণাতলা পর্যন্ত রাস্তাটি সুন্দর ও চকচকে লাইটিং করা হলেও খোঁড়াখুড়ির কারনে অনেক রাস্তা চলাচলে মানুষের ভোগান্তি বেড়েছে।

সংশ্লিষ্ট সুত্রে জানা যায়, ১৮৭৬ সালের ১ এপ্রিলে ১০.৩৯৫ বর্গ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে গঠিত হয়। লোকসংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। ৯ টি ওয়ার্ড ও ১৯ টি মহল্লায় ৪৯৪৬ খানার সংখ্যা নিয়ে গঠিত পৌর এলাকায় শিক্ষার হার প্রায় ৭০%। প্রাচীন এই পৌরসভায় পৌর সচিব, সহকারী প্রকৌশলী, উপ সহকারী প্রকৌশলী ও হিসাব রক্ষন কর্মকর্তা কর্মরত থাকলেও গুরুত্বপুর্ণ পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা ও এমবিবিএস ডাক্তারের পদ ২ টি দীর্ঘদিন যাবৎ শূন্য রয়েছে। ৩২ জন পরিচ্ছন্ন কর্মী সহ প্রায় ৫২ জন কর্মকর্তা কর্মচারী পৌরসভায় কর্মরত রয়েছেন। তাদের জন্য প্রতি মাসে প্রায় ১৬ লক্ষ টাকা বেতন ভাতা প্রদান করতে হচ্ছে। পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী এস এম শফিকুল ইসলাম জানান ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫ তলা পৌর কিচেন মার্কেট সহ প্রায় ৩০ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। তবে গত অর্থ বছরে শেরপুর পৌর পার্ক সংস্কারের জন্য ৩ লক্ষ টাকা বরাদ্দ হলেও সেখানে কোন কাজ হয়নি। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী খুব নিঁচু স্বরে বলেন চলতি অর্থ বছরে এডিপি’র প্রকল্পের সাথে পৌর পার্কের সংস্কারের কাজ করা হবে। পৌরসভার বিভিন্ন রাস্তার বেহাল অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন বিশ্বব্যাংক শেরপুর পৌরসভায় উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহন করায় রাস্তা সংস্কারের জন্য আগের মত আর কোন সরকারী বরাদ্দ পাওয়া যায় না। পৌর সভার উপ সহকারী প্রকৌশলী হুমায়ন কবির বলেন চলতি অর্থ বছরে এডিপি’র ৬৪ লক্ষ টাকার কাজের টেন্ডার আহবান প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তিনি আরও বলেন নিজস্ব আয় থেকে প্রায় ৩৬ লক্ষ টাকার বিভিন্ন উন্নয়ন কাজ কাউন্সিলরদের মাধ্যমে করা হয়ে থাকে।
পৌরসভার সুপারভাইজার রেজাউল করিম জানান পৌরসভার ৭টি গর্বেজ ট্রাক, ১ টি ভ্যাকুম ট্যাংকার, ১টি বীম লিপ্টার, ১টি রোডার মেশিন, ৪টি রোলার ও ময়লা ফেলার জন্য ১১ টি ছোট ভ্যানগাড়ী রয়েছে। এর মধ্যে ২ টি গার্বেজ ট্রাক অকেজো হয়ে পড়েছে। ১ টি নতুন সহ ৩/৪ টি গার্বেজ ট্রাক চালু থাকলেও চালক মাত্র ২ জন। তারাও দিনে ১ ট্র্রিপ ময়লা ফেলার পর আর কাজ করতে চায়না।
পৌরসভার হিসাব বিভাগ সুত্রে জানা যায় গত অর্থ বছরে বারোদুয়ারী হাট, সকাল বাজার ও বিকাল বাজার থেকে ১ কোটি ২৮ লক্ষ টাকা, পৌরকর থেকে ৩০ লক্ষ ১১ হাজার টাকা, ট্রেড লাইসেন্স ফি বাবদ ২০ লক্ষ ৮৩ হাজার টাকা, ভুমি রেজিষ্ট্রি অফিস থেকে ২% হিসাবে ৪৭ লক্ষ ১৯ হাজার টাকা সহ প্রায় ২ কোটি ৫৫ লক্ষ টাকা নিজস্ব আয় হয়েছে। নিজস্ব আয় থেকেই প্রায় ২ কোটি টাকা কর্মকর্তা কর্মচারীদের বেতনভাতা প্রদান করতে হয়। তারপরও তাদের কমপক্ষে ১০/১২ মাসের বেতন ভাতা বকেয়া রয়েছে। কর্মচারীদের বেতন ভাতা বকেয়া রয়েছে বলে পৌর হিসাব রক্ষন কর্মকর্তা রেজাউল করিম কর্মকর্তা স্বীকার করেন।
নানা অনিয়ম ও দূর্নীতির অভিযোগ উঠেছে শেরপুর পৌরসভার সচিব ইমরোজ মুজিবের বিরুদ্ধে। তিনি অফিস সময় সকাল ৯ টা হলেও তিনি নিজের খেয়াল খুশি মত অফিস করেন। সচিবের অফিস রুমে প্রায়ই তালা ঝুলতে দেখা যায়। তার সাথে মোবাইল ফোনে এই প্রতিনিধি একাধিকবার যোগাযোগ করলেও তিনি ফোন রিসিভ করনেনি। এ ছাড়া অনেক কর্মচারী অফিস থেকে ছুটি না নিয়ে ছুটি কাটান বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ ব্যাপারে কোন কর্মচারীদের জবাবদিহিও করতে হয় না। ৩২ জন পরিচ্ছন্ন কর্মী থাকা সত্বেও কোন কোন রাস্তায় যেমন ময়লা আবর্জনার ভাগাড়ে পরিনত হয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পৌর এলাকার বিভিন্ন মহল্লার বাসিন্দারা নির্ধারিত স্থানে ডাস্টবিন না থাকায় যত্রতত্র ময়লা আবর্জনা ফেলছেন। ব্যবসায়ী আব্দুল হালিম খোকন, পৌরসভার নাগরিক আব্দুল মতিন, নাজমুল হক, আশরাফুল আলম, গোলাম মোস্তফা, আব্দুর রহিম সহ বেশ কয়েকজন বলেন কিছু কিছু স্থানে পৌর কর্তৃপক্ষ যে সব ডাস্টবিন নির্মাণ করেছে, সেগুলোও নিয়মিত পরিষ্কার না করায় ময়লা-আবর্জনা উপচে পড়ে সড়কে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। দুর্গন্ধে পথচারীরা নাক-মুখ চেপে চলাচল করছেন। এ ছাড়া পৌর এলাকায় শুকরের উপদ্রবে পৌরবাসী অতিষ্ট হয়ে পরেছে। বৃষ্টি না হলেও পৌর সভার গুরুত্বপুর্ণ বাসপট্টি সড়ক, বাসস্ট্যান্ড থেকে হাটখোলা সড়ক সব সময় জলাবদ্ধ দেখা যায়। আবার সামান্য বৃষ্টি হলেই শহরের শান্তিনগর, টাউনকলোনী, জগ্ননাথপাড়া, স্যানালপাড়া সহ বিভিন্ন এলাকার রাস্তা পানির নিচে তলিয়ে যায়। অনেক বাসা বাড়িতেও পানি ওঠে। ফলে পৌরবাসীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

পৌরপার্ক সংস্কারের জন্য ৩ লক্ষ টাকা সরকারী বরাদ্দ এলেও পৌরসভার সচিব কাউন্সিলরদের জানায়নি বা ৩ টাকার কাজও করা হয়নি, প্রশাসনিক দুর্বলতার কারনে কর্মচারীদের কেউ কাউকে মানতে চায়না, পৌর ট্যাক্স ও ট্রেড লাইসেন্স ফি ঠিক মত আদায় হয়না। গার্বেজ ট্রাকের ২ জন চালক ৭ দিনে ২ দিন কাজ করলেও দিনে ১ ট্রিপের বেশী দেয় না। তিনি আরও বলেন মশা মারার জন্য ওষুধ ও ১ টি ফকার মেশিন ক্রয়ের জন্য ৫ লক্ষ টাকার দরপত্র আহবান করা হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে অপর একজন পৌর কাউন্সিলর বলেন, ৩২ জন পরিচ্ছন্ন কর্মী সহ ১২ জন অতিরিক্ত শ্রমিক প্রতিদিন কি কাজ করছে যে ময়লা অবর্জনা পরিস্কার হয়না, দুর্গন্ধে পথচারীদের নাক-মুখ চেপে চলাচল করতে হচ্ছে বলে কাউন্সিলর বদরুল ইসলাম পোদ্দার ববি। তবে পৌরসভার নিজস্ব আয় থেকেই অনেক উন্নয়ন সম্ভব। কিন্তু মেয়রের আন্তরিকতার অভাবে এসব উন্নয়ন কর্মকান্ড থেকে বঞ্চিত হচ্ছে পৌরবাসী। তবে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির জন্য দায়ী কে এমন প্রশ্নে মেয়রের উদাসীনতা ও প্রশাসনিক দূর্বলতা রয়েছে বলে ওই কাউন্সিলর দাবী করেন ।

একজন পৌর কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন পৌরসভার মেয়রের সততা ও সরলতার সুযোগ নিয়ে পৌরসভার সচিব ও পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী সহ কতিপয় পৌর কাউন্সিলর সিন্ডিকেট তৈরী করে সবকিছু লুটেপুটে খাচ্ছে। তবে এসব অভিযোগ মানতে নারাজ পৌরসভার সচিব ইমরোজ মুজিব সহকারী প্রকৌশলী এস এম শফিকুল ইসলাম ।

এ বিষয়ে পৌরসভার মেয়র আলহাজ¦ আব্দুস সাত্তারের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫ তলা পৌর কিচেন মার্কেট, ৮ কোটি ৬৮ লক্ষ টাকা ব্যয়ে মাষ্টার ড্রেন নির্মাণ, ২ কোটি টাকা ব্যয়ে ২টি পৌর কবরস্থান সংস্কার সহ প্রায় ৩০ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। প্রকল্পগুলির কাজ শেষ হলে উন্নয়ন দৃশ্যমান হবে। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান নানা অজুহাতে মাষ্টার ড্রেন নির্মাণ কাজ সময়মত শেষ করতে পারায় পানি নিষ্কাশনে কিছুটা সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। তাছাড়া পৌর কর্মচারীরা তাদের দাবী নিয়ে আন্দোলন করতে প্রায় একমাস ঢাকায় থাকায় সাময়িকভাবে ময়লা অবর্জনা রাস্তায় দেখা গেলেও পৌরসভার পরিচ্ছন্ন কর্মী সহ অতিরিক্ত শ্রমিক দিয়ে পরিচ্ছন্ন অভিযান শুরু করায় অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই শেরপুর পৌর শহর আবার পরিচ্ছন্ন শহরে পরিনত হবে বলে পৌরসভার মেয়র দাবী করেন।

x