স্বাধীনতাহীনতায় বেঁচে থাকে ওরা

0 262

জাতীয় ডেস্ক: এক নদী রক্ত পেরিয়েই বাংলার আকাশে স্বাধীনতার সূর্য উত্থিত হয়েছিল। আর এই স্বাধীনতার মূলমন্ত্র ছিল শোষণ-বৈষম্যহীন সাম্যের সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি। মানুষের মৌলিক অধিকার ও স্বাধীন চিন্তার অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। সেই লক্ষ্য আর বুক ভরা আশা নিয়ে একাত্তরের রণাঙ্গণে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বাংলার কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষ। লাল-সবুজের পতাকাকে শত্রুর নজর থেকে ছিনিয়ে আনতে বুকের তাজা রক্ত ঢেলেছিল বাঙালি। তাদের সেই রক্তের পথ ধরেই রচিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের পথচলা। কিন্তু স্বাধীনতার সুদীর্ঘ ৪ যুগ পেরিয়ে গেলেও গণমানুষের শোষণমুক্তি ঘটেনি এখনও। এখনও পথে-ফুটপাতে খেয়ে না খেয়ে জীবনের সঙ্গে আপ্রাণ যুদ্ধ করে বেঁচে থাকতে হয় স্বাধীন দেশের অগণিত মানুষকে।

মহান স্বাধীনতা দিবসে প্রায় সকল পেশার চাকুরীজিবীরা ছুটি ভোগ করছেন। কিন্তু কিছু মানুষ রয়েছেন যারা একদিন একবেলাও যদি কাজ না করেন তাহলে পরিবার নিয়ে থাকতে হয় অনাহারে। এরকমই অসংখ্য বাস্তব চিত্র চোখে পড়ে রাজধানী ঢাকার অলিতেগলিতে, বিভিন্ন বস্তিতে। আজ মহান স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরেও এসব মানুষের কাছে স্বাধীনতা মানে পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেয়া। ঝড় নাই, বৃষ্টি নাই- সব বাধা উপেক্ষা করে প্রতিনিয়ত জীবন সংগ্রামের চাকা সচল রাখাই যেন তাদের স্বাধীনতা।

তেমনই একজন খেটেখাওয়া মানুষ হাবিব। গ্রামের বাড়ি মাদারীপুর জেলার কালকিনী উপজেলার শাহজাহানপুর ইউনিয়নে। পরিবারের চার মেয়ে দুই ছেলেসহ সদস্য সংখ্যা ৮ জন। এক ছেলে কেরানীগঞ্জে অন্যজন চকবাজারের দোকান শ্রমিক। দুই মেয়ের মধ্যে একজন বিবাহিত। আরেকজন ৩য় শ্রেণির ছাত্রী। মেঝো মেয়েটা প্রতিবন্ধী, আর ছোট মেয়েটার বয়স পাঁচ বছর। এই নিয়েই হাবিবের পরিবার। সবাইকে নিয়ে কেরানীগঞ্জে থাকেন।

প্রতিদিন জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে শশা ও মুড়ি বিক্রি করেন হাবিব। তাতে দিনশেষে রোজগার হয় গড়ে প্রায় ৫-৬শ টাকা। ১৯৯৮ সাল থেকে এই মুড়ি ও শশা বিক্রির পেশার সঙ্গে জড়িত হাবিব। স্বাধীনতার এই দিনে কথা হয় খেটে খাওয়া এই মানুষটির সঙ্গে। ব্রেকিংনিউজের মুখোমুখি হয়ে হাবিব তুলে ধরেন তার পাওয়া-না পাওয়া, স্বপ্ন আর প্রত্যাশার কথাগুলো।

আজকে ছুটির দিনেও আপনি কাজ করছেন, আপনি কি মনে করেন স্বাধীনতার পূর্ণ সাধ ভোগ করতে পারছেন?

উত্তরে হাবিব বলেন, আমি যেভাবেই কাটাই, যাই করি, আমার মনে হয়, আমি ব্যবসা করি, এটাই স্বাধীনতা। ফ্যামিলি নিয়া চলতে হয়তো একটু কষ্ট হইতাছে। ব্যবসা বাণিজ্য ভালো নাই, খুবই কষ্ট করতেছি। যা কামাই করি সেটা দিয়ে চলে, কোনও মাসে দেনা করা লাগে। এভাবেই চলতাছে।

আমাদের স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য ছিল অর্থনৈতিকভাবে মানুষের স্বাবলম্বী হওয়া আপনি কি সেটা পেয়েছেন?

হাবিবের জবাব, না আমি পারি নাই।

পারেন নাই কেন?

কেন পারি নাই এটা তো আর আমি উত্তর দিতে পারবো না। আমার পেছনে কোনও লোক নাই। আমারে সাহায্য করার কেউ ছিল না, আমার ভাগ্যে নাই, হয়তো এই জন্য পারি নাই।

আপনার মেয়ে প্রতিবন্ধী, সরকারের পক্ষ থেকে কখনও কোনও সুযোগ-সুবিধা পেয়েছেন?

না কোনও সুযোগ-সুবিধা সরকারের পক্ষ থেকে পাইনি।

আজকে তো একটা বিশেষ দিন, আমাদের মহান স্বাধীনতা দিবস। আজকের দিনে আপনি কাজে বাইরে কেন?

বলতেই সরাসরি উত্তর- পেটের ক্ষুধায়। আমি যদি আজকে কাজে না বের হই আমার পোলাপান কালকে কী খাবে? কে দিবে খাবার? আমার প্রতিবন্ধী মেয়েটার প্রতিদিন ১০০ টাকার ওষুধ লাগে। এটাতো সরকার আমারে দিবো না, কেউই তো দিব না। আমারটা আমারেই জোগাড় করতে হইবো।

তার মানে আজকে আপনি কাজে বের না হলে আপনার পরিবার না খেয়ে থাকত, তাই তো?

অবশ্যই। আমারে তো আর কেউ দিব না। আমার নিজেরটা নিজেরই জোগাড় করতে হবে। কেউ যদি দিত তাহলে আজকের দিনে আমি কাজে বাইরে হইতাম না।

সরকার বলছে যে দেশে ব্যাপক উন্নয়ন হচ্ছে, দেশে গরিবের সংখ্যা কমছে, মানুষের আয় বাড়ছে- এ বিষয়ে আপনার মতামত কি?

এ বিষয়ে আমার কোনও মতামত নাই। আমি কিছু বলতে পারব না। আমি কিছু জানি না।

আপনি কি বোঝেন না যে, কী রকম কী উন্নয়ন হচ্ছে, কী হচ্ছে না হচ্ছে?

আমি লেখাপড়া জানি না, লেখাপড়া করি নাই টিভি দেখি না, পড়তে পারি না, এজন্য বুঝিও না। কিছু জানিও না, কিছু বলতেও পারব না।

উন্নয়নের ছোঁয়া কি আপনি বাস্তবে অনুভব করতে পারেন?

না এটা আমি অনুভব করতে পারি না। এমন কিছু মনে হয় না। আমি তো আগের মতোই আছি।

দেশ যে উন্নয়ন হচ্ছে এটা কি আপনি বুঝতে পারেন না?

না আমি একই কথা বলতেছি আমি এটা বুঝিনা। উন্নয়ন কাকে বলে কিভাবে হয় আমি এটা বুঝিনা।

আপনি দেশের মানুষের উন্নয়ন কি এটা বুঝেন না? মেট্রোরেল হচ্ছে আপনি অ্যান্ড্রয়েড ফোন ব্যবহার করছেন, তারপরেও উন্নয়ন বোঝেন না?

আমি তো ফোন ইউজ করিনা, আমার পোলাপাইনও করে না। আমার মত নিরীহ লোক স্বাধীনতা কেমনে ভোগ করবে। আমি পারছি না। স্বাধীনতা তো কিছু মানুষ ভোগ করছে।

কেন পারছেন না?

পারছি না যেমন আজকে আমার টাকা থাকলে আমি একটা বড় ব্যবসা করতে পারতাম। টাকা  নাই একটা ক্ষুদ্র ব্যবসা করি। আজকে কাজে না বের হলে আমার ফ্যামিলি না খেয়ে থাকবো। আমার চালান কম, আমারে কেউ হেল্প করে না।

আচ্ছা আজকে তো স্বাধীনতার ৪৮ বছর চলে গেল। আপনার চাওয়া কি?

এখন আমার চাওয়া সারা দেশের মানুষ সবাই ভালো থাকুক, আমিও ভাল থাকি, দেশের মানুষ ভালো থাকলে আমিও ভালো থাকবো। দেশ ভালো মতো চলুক, কোন ঝামেলা না হোক।

অনেকটা হাবিবের মতোই অবস্থা শরীয়তপুরের আকতার হোসেনেও। থাকেন ঢাকার কামরাঙ্গীর চর। স্বাধীনতা দিবসে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে পানি বিক্রি করছেন। দিবসটি নিয়ে কথা হয় তার সঙ্গেও।

আজকে তো স্বাধীনতা দিবস। এই দিনেও কাজ করছেন?

আকতার হোসেন বলেন, আমি ৭ বছর যাবত এই এলাকায় পানি বিক্রি করি। আজও তা-ই করতেছি, পেটের দায়ে বাইর হইছি, কাজ না করলে খামু কি? একদিন কাজ বন্ধ থাকলে খাওনও বন্ধ থাকবো। পেট বাঁচানোই আমাগোর স্বাধীনতা।সূত্র: ব্রেকিংনিউজ/

Leave A Reply

Your email address will not be published.

x