দেশে গরিবের মুখের গ্রাস কেড়ে নেয়ার মহোৎসব চলছে: রিজভী

0 35

বিডি সংবাদ টোয়েন্টিফোর ডটকম: করোনা ভাইরাসের কারণে কর্মহীন দরিদ্র মানুষের জন্য সরকার যে পরিমাণ চাল বিতরণ করছে তা মোটেও পর্যাপ্ত নয় বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। এক্ষেত্রে ‘মরার উপর খাড়ার ঘাঁ’ হিসেবে যোগ হয়েছে চাল চুরির মহোৎসব।

দলটির দাবি, গণমাধ্যমে প্রতিদিন যে পরিমাণ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রকাশিত হচ্ছে তার চেয়েও চাল চোরের সংখ্যা বেশি। এমতাবস্থায় অবিলম্বে ত্রাণের চাল বিতরণের দায়িত্ব সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দিয়ে দ্রুততার সাথে পরিচালনা করতে হবে। তাতে হয়তো হতদরিদ্র, বেকার শ্রমিকরা উপকৃত হবে এবং জনগণের মধ্যে স্বস্তি আসবে। কেননা এখন রাজনীতি করার সময় নয়। বরং ভেদাভেদ ভুলে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার সময় এখন।

রবিবার (১২ এপ্রিল) সকালে নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ে এক ভিডিও কনফারেন্সে এসব কথা বলেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী।

তিনি বলেন, ‘অবিচার-অনাচার, দুঃশাসনের জন্ম দেয়া হয়েছে আজ। তার কুফল দেখতে পাচ্ছে সমগ্র জাতি। মরণঘাতি করোনা ভাইরাস যখন প্রতি রাষ্ট্র ও সমাজকে থমকে দিয়েছে তখন বাংলাদেশে চলছে দরিদ্র মানুষের মুখের গ্রাস কেড়ে নেয়ার মচ্ছব। তারা দেশের এতো উন্নয়ন করেছে, বিশেষ করে বিদ্যুতের উন্নয়নে দেশ নাকি আলোয় ঝলমল করছে। অথচ এই করোনা দুর্যোগে বিদ্যুতের অভাবে করোনার কিট উৎপাদন করতে পারছে না গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। উপরন্তু গত দুই সপ্তাহ ধরে পত্রিকার পাতাজুড়ে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের চাল চুরির খবর প্রকাশিত হলেও এ পর্যন্ত কারও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির খবর আমরা পাইনি। যার কারণে এ লুটেরা গোষ্ঠী বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।’

সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে রিজভী বলেন, ‘এদের লাগাম এখনই টেনে ধরুন। না হলে জনগণ রুখে দাঁড়াতে বাধ্য হবে। জাতির এই ক্রান্তিকালে যারা গরিবের হক মেরে খায় তারা দেশের শত্রু এবং মানবতার শত্রু। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেছিলেন- ‘করোনার চেয়েও আমরা বেশি শক্তিশালী’। সেটিই প্রমাণিত হলো- করোনা রোগী সনাক্ত যতো হচ্ছে তার চেয়েও বেশি ত্রাণের চাল চোর ধরা পড়ছে।’ব্রেকিংনিউজ

তিনি বলেন, ‘করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে বাংলাদেশে। গতকাল (শনিবার) পর্যন্ত দেশের ৩১ জেলায় করোনার সংক্রমণ ছড়িয়েছে। আক্রান্ত আর মৃতের সংখ্যা বাড়ছে আশংকাজনকভাবে। লকডাউনের কারণে সমগ্র দেশে কয়েক কোটি হতদরিদ্র এবং বেকার মানুষ অতি কষ্টে জীবনযাপন করছে। করোনার বিস্তার রোধে সবাই ঘরবন্দি হয়ে থাকায় দিনমজুর, ক্ষুদ্র কৃষক, শ্রমিকসহ গরিব মানুষের একটি বড় অংশ কর্মহীন। রোজগার বন্ধ হওয়ায় পেটে ভাত জোগানোই মুশকিল হয়ে পড়েছে। তাদের এই কষ্ট লাঘবের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে স্বল্পমূল্যে চাল এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী বিতরণের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। কিন্তু এতো বড় মহামারির মধ্যেও ক্ষমতাসীন দলের দুর্নীতিবাজরা ত্রাণ ও স্বল্পমূল্যের চাল আত্মসাৎ করছে।’

রিজভী আরও বলেন, ‘সরকারি হিসাবে দেশের খাদ্য গুদামগুলোতে ১৭.৫১ লক্ষ টন চাল মজুদ আছে। এই পরিমাণ চাল দিয়ে ৩/৪ কোটি মানুষকে ৬ মাস অনায়াসে খাওয়ানো সম্ভব। অথচ মানুষ অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছে। ক্ষুধার জ্বালায় রাস্তায় পড়ে থাকছে। সিরাজগঞ্জের বেলকুচি পৌর এলাকায় একটি হৃদয়বিদারক মর্মস্পর্শী ঘটনায় সবাই নির্বাক হয়ে গেছে। সেখানে আফরোজা খাতুন নামে এক শিশু ক্ষুধার যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে।’

তিনি বলেন, ‘যেখানে কে বাঁচবে কে বাঁচবে না তার কোনও নিশ্চয়তা নেই, যেখানে জীবন এখন অনেক বেশি অনিশ্চিত সেখানে কী করে আওয়ামী লীগের লোকজন ত্রাণের মালামাল চুরি করে খায়? লোভ-লালসা এদের লজ্জা-শরম, বিবেক-বোধ সবকিছু অন্ধ করে দিয়েছে। এই করোনাভাইরাস পরিস্থিতির মধ্যেও থেমে নেই ত্রাণের চাল চুরি। চাল চুরির ঘটনায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাই বেশি জড়িত। সারা দেশে গত ৯ দিনে অন্তত ২ হাজার ২৬৪ বস্তা সরকারি ত্রাণের চাল চুরির খবর পাওয়া গেছে। পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে- চট্টগ্রামে সরকারি চাল আত্মসাতের বড় ঘটনা ঘটছে। বুধবার থেকে পূর্ববর্তী এক সপ্তাহে একটি সিন্ডিকেট বস্তা পাল্টে খোলাবাজারে অন্তত ২০ হাজার বস্তা সরকারী চাল বিক্রি করে দিয়েছে বলে জেনেছে পুলিশ।’

ব্র্যাকের সাম্প্রতিক জরিপের উদ্ধৃতি দিয়ে এসময় রিজভী বলেন, ‘দেশে চরম দারিদ্র্য অবস্থা আগের তুলনায় ৬০ শতাংশ বেড়েছে। প্রায় ১৪ ভাগ মানুষের ঘরে খাবার নেই। ২৯ শতাংশ মানুষের ঘরে আছে মাত্র ১ থেকে ৩ দিনের খাবার। দেশ ‘উত্তম’ আয়ের নাকি ‘মধ্যম’ আয়ের, দেশের অবস্থা এখন ‘মিরপুর’ নাকি ‘সিঙ্গাপুর’ এখন এইসব কাগুজে বিতর্কের সময় নয়। এখন সরকারের প্রধান দায়িত্ব ও কর্তব্য হচ্ছে, প্রায় তিন কোটি মানুষের ঘরে ত্রাণ পৌঁছে দেয়া। অথচ এর পরিবর্তে জনগণ দেখছে ভিন্ন চিত্র। কথায় বলে ‘কারো ঘর পোড়ে, কেউ আলু পোড়া খায়..’। অনেকেরই হয়তো মনে আছে যে, স্বাধীনতাত্তোরকালেও একবার এমন সীমাহীন দুর্নীতি-দুর্ভিক্ষ-দুরাচারে পতিত হয়েছিল বাংলাদেশ। অনাহারি-বুভুক্ষ মানুষের সেই তীব্র যন্ত্রণা আর ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছিল কবি রফিক আজাদের কবিতায়। তিনি লিখেছিলেন, ‘গাছপালা, নদী-নালা, গ্রাম-গঞ্জ, ফুটপাত…, উড্ডীন পতাকাসহ খাদ্যমন্ত্রী ও মন্ত্রীর গাড়ী, আমার ক্ষুধার কাছে কিছুই ফেলনা নয় আজ, ভাত দে হারামজাদা, তা না হলে মানচিত্র খাবো’।’

রিজভী বলেন, ‘আমরা দলীয়ভাবেও সারা দেশে সাধ্যমতো জনগণের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি। এটাই আমাদের দলের চেয়ারপারসন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দেশনায়ক তারেক রহমানের নির্দেশ। বিএনপি এবং বিএনপির অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরাও তাদের সাধ্যমতো জনগণের প্রতি সহায়তার হাত বাড়িয়েছে। পাশাপাশি ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) এর মতো পেশাজীবী সংগঠনের নেতাকর্মীরাও বসে নেই। আপনারা  জানেন, শহীদ জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন এবং ড্যাব এর উদ্যোগে গত শুক্রবার থেকে দেশের ৮৪টি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজ এবং ডেন্টাল কলেজ হাসপাতালের ডাক্তার নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীদেরকে জন্য পার্সোনাল প্রটেকশন ইকুইপমেন্ট (পিপিই) বিতরণ কর্মসূচি শুরু করেছে। সাধ্যমতো এই কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘কর্মসূচির প্রাক্কালে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান তারেক রহমান ‘ডাক্তার নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মী’দের উদ্দেশ্যে বলেছেন, ‘করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে সম্পূর্ণ দলীয় কিংবা রাজনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে এই মুহূর্ত থেকেই আমাদের প্রতিটি নাগরিককে একে অপরের সহায়তায় ভূমিকা রাখা এখন সময়ের দাবি’। সুতরাং আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, এখন রাজনীতি করার সময় নয়। এখন দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের প্রতি সহায়তায় হাত বাড়ানোর সময়।’

‘আমাদের সময়মত কার্যকর পদক্ষেপ না নেয়ার মাশুল হিসেবে করোনা তৃতীয় ধাপ অতিক্রম করছে। বিশ্ববাসীকে সতর্ক করে দিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক বলেছেন, ‘সব দেশকে অতিমাত্রায় সাবধান হতে হবে। তড়িঘড়ি করে লকডাউন প্রত্যাহার হলে করোনা পরিস্থিতির আরও ভয়াবহ পুনরুত্থান হবে’। সুতরাং সরকারের একটি সমন্বিত কর্মপন্থা প্রয়োজন। সরকারকে সবার আগে ভাবতে হবে যে, কোটি কোটি রোজগারহীন মানুষের মুখে কিভাবে খাদ্যের যোগান দিবে? দরিদ্র ও মধ্যবিত্তদের রেশন সুবিধা কখন নিশ্চিত করবে? আগামী মাসে ধান কাটার মৌসুমে ধান কাটার লোকের যোগান কিভাবে দিবে? গত বছর যেহেতু ধান কাটার লোকের অভাবে কৃষকরা ক্ষেতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল এমনটা যেন এই দুর্যোগের বছরে আর না হয়, সেটা এখন থেকেই নিশ্চিত করতে হবে’- যোগ করেন রিজভী।

একইসঙ্গে স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে ভাইরাসটির ভয়াবহতা থেকে দেশকে রক্ষা করতে সকল ভেদাভেদ ভুলে একযোগে কাজ করারও আহ্বান জানান তিনি।

Leave A Reply

Your email address will not be published.