পাবনায় গাড়ি চালক সম্রাটের মরদেহ উদ্ধার, গ্রেপ্তার সুমী খাতুন দুইদিনের রিমান্ডে

0 ১৭৬
পাবনা প্রতিনিধি : পাবনা-কুষ্টিয়ার সীমান্তবর্তী পদ্মার চরে পরিত্যক্ত প্রাডো জিপ থেকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের গাড়িচালক সম্রাট হোসেনের লাশ উদ্ধারের ঘটনায় গ্রেপ্তার সুমী খাতুনের দুই দিনের রিমান্ড আবেদন মঞ্জুর করেছেন আদালত।
রোববার (২৬ মার্চ) দুপুরে পাবনার আমলি আদালত-২-এর বিচারক শামসুজ্জামান এ আদেশ দেন।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও ঈশ্বরদী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) তৌহিদ হোসেন। তিনি জানান, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সুমী খাতুনকে আদালতে সোপর্দ করে পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন জানানো হয়। আদালত ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
তাঁকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হবে। দুদিন পর আগামী মঙ্গলবার (২৮ মার্চ) আবার তাঁকে আদালতে হাজির করা হবে।
সুমী খাতুন সম্রাটের বন্ধু আব্দুল মমিনের স্ত্রী। তাঁর বাড়ি ঈশ্বরদী উপজেলার বাঁশেরবাদা গ্রামে। ঘটনার পর থেকে পলাতক রয়েছেন আব্দুল মমিন। নিহত সম্রাটের বাড়ি একই উপজেলা মধ্য অরনকোলা আলহাজ ক্যাম্প এলাকায়।
গত শনিবার (২৫ মার্চ) দিবাগত রাতে ঈশ্বরদী থানায় সম্রাটের বাবা আবু বক্কার বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেন। মামলায় সম্রাটের বন্ধু আব্দুল মমিন ও তাঁর স্ত্রী সীমা খাতুনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৩ থেকে ৪ জনকে আসামি করা হয়। গত শুক্রবার (২৪ মার্চ) রাতে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে সম্রাটের বন্ধুর স্ত্রী সীমা খাতুনকে নিজ বাড়ি থেকে আটক করে পুলিশ। মামলার পর তাঁকে ওই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
এর আগে শনিবার সকালে পাবনা কুষ্টিয়ার সীমান্তবর্তী পদ্মার চর এলাকায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি গাড়ি থেকে দুর্গন্ধ পেয়ে পুলিশকে জানান স্থানীয়রা। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে গাড়ির ভেতর থেকে সম্রাটের মরদেহ উদ্ধার করে। সম্রাট গত বৃহস্পতিবার থেকে নিখোঁজ ছিলেন।
এ বিষয়ে ঈশ্বরদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) অরবিন্দ সরকার বলেন, সম্রাট রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের আরডিবি নামে একটি যানবাহন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের চালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। গাড়িটি ওই প্রকল্পে কর্মরত রাশিয়ান নিকিমত কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইউরি ফেদারোপ ব্যবহার করতেন।
ঈশ্বরদী থানা পুলিশ ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, সম্রাট ও গ্রেপ্তার সীমা খাতুনের স্বামী আব্দুল মোমিন দুজনই স্থানীয় আরবিডি কোম্পানির মাধ্যমে রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পে নিকিমথ কোম্পানির গাড়িচালক ছিলেন। একসঙ্গে কাজের সূত্রে দুইজনের মধ্যে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। এ কারণে আব্দুল মোমিনের বাড়িতে সম্রাটের অবাধ যাতায়াত ছিল। কিছু দিন আগে সম্রাটের গাড়িতে ঈশ্বরদী যাওয়ার সময় সীমাকে কোমল পানীয়তে কিছু একটা মিশিয়ে পান করানো হয়। এতে সে অচেতন হয়ে পড়লে সম্রাট গাড়িতেই সীমাকে ধর্ষণ করে।
সেই ভিডিও মোবাইল ফোনে ধারণ করে রাখেন। এরপর সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে মাঝে মধ্যেই সীমাকে ধর্ষণ করতেন। কয়েক দিন আগে মোবাইলে ধারণকৃত ভিডিও মুছে ফেলার কথা বলে সীমাকে পাকশী রিসোর্টে ডেকে নিয়ে যান সম্রাট। সেখানেও তাকে ধর্ষণ করা হয়। অনুরোধ করার পরও ভিডিও মুছে ফেলেননি সম্রাট।
এরপর গত বৃহস্পতিবার দুপুরে সম্রাট গাড়ি নিয়ে বন্ধু আব্দুল মোমিনের বাড়িতে যায়। তার মাথা ব্যথা করছে জানিয়ে মোমিনের বিছানায় শুয়ে পড়েন। আর বন্ধু আব্দুল মোমিনকে স্থানীয় ফার্মেসির দোকানে ওষুধ আনতে পাঠান। মোমিন দোকানে গেলে মোমিনের স্ত্রী সীমাকে ধর্ষণের চেষ্টা করেন সম্রাট। এ সময় সীমা ঘরে থাকা হাতুড়ি দিয়ে মাথায় আঘাত করে সম্রাটকে গুরুতর আহত করে।
মোমিন ওষুধ নিয়ে বাসায় ফিরে অবস্থা বেগতিক দেখে ও স্ত্রীর নিকট থেকে সব শুনে আহত সম্রাটকে বস্তায় ভরে গাড়িতে তুলে চলে যান। এই সময় সম্রাট মৃত্যু যন্ত্রণায় বস্তার ভেতর থেকে গোংরাতে থাকে। তখন তারা গাড়িতে উচ্চ শব্দে গান বাজিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে থাকেন। তার মৃত্যু নিশ্চিত হলে সীমাকে পাবনা সদরের মাধপুর এলাকায় নামিয়ে দিয়ে বস্তাভর্তি লাশ নিয়ে গাড়িসহ মোমিন চলে যান।
শনিবার সকালে পাবনা কুষ্টিয়ার সীমান্তবর্তী নির্জন পদ্মার চর এলাকায় একটি প্রাডো জিপ গাড়ি দেখতে পেয়ে স্থানীয়দের সন্দেহ হলে তারা পুলিশে খবর দেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে জিপের ভেতর থেকে সম্রাটের মরদেহ উদ্ধার করে। পরে নিহতের স্বজনেরা গিয়ে মরদেহটি সম্রাটের বলে শনাক্ত করেন।
নিহত সম্রাটের বাবা আবু বক্কর বলেন, আমার ছেলে সম্রাট তার বন্ধু মোমিন ও মোমিনের স্ত্রীকে চাকরি দিয়েছিল। তবে তাদের চাকরি চলে যায়। আবারও তাদের শ্রমিক হিসেবে চাকরি পাইয়ে দেয়। আমার ছেলে নিকিমত কোম্পানিতে কয়েকটি গাড়ি ভাড়াও দিয়েছিল। প্রতি মাসে বড় অংকের টাকা বিল তুলতো।
গেল বৃহস্পতিবার বিল হয়। কৌশলে আমার ছেলেকে স্বামী-স্ত্রী ডেকে নিয়ে টাকা হাতিয়ে নিয়ে হত্যা করেছে। সীমার স্বামী মোমিনকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন তিনি।
ঈশ্বরদী থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) অরবিন্দ সরকার আরো জানান, গ্রেপ্তার সীমা পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। রোববার দুপুর ২টার দিকে তাকে পাঁচ দিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে তোলা হলো বিচারক দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। দুই দিনের রিমান্ড শেষ হলে তাকে কারাগারে পাঠাতে বলা হয়েছে।
এর আগে শনিবার (২৫ মার্চ) রাতে ঈশ্বরদী থানায় নিহতের বাবা আবু বক্কর বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেন। মামলায় সম্রাটের বন্ধু আব্দুল মোমিন ও মোমিনের স্ত্রী সীমা খাতুনসহ অজ্ঞাতনামা আরও তিন থেকে চারজনকে আসামি করা হয়েছে।

Leave A Reply

Your email address will not be published.