বগুড়ায় বৈশাখী মেলায় চিত্ত বিনোদনে মুগ্ধ দর্শনার্থীরা

0 ৮৩

দীপক কুমার সরকার,বগুড়া: মেলা মানেই লোকে লোকারণ্য, মেলা মানেই হৈ-চৈ, গান-বাজনা ও বিভিন্ন প্রকার প্রসাধনী এবং তৈজসপত্র ক্রয়-বিক্রয়ের কেন্দ্র। তাছাড়া চিত্ত বিনোদনের খোরাক মেটানোর পরিপূর্ণ স্থলও বললেও ভুল হবেনা। প্রাচীন ঐহিত্যে ও সংস্কৃতির অংশ হিসেবে আবহমান গ্রাম-বাংলার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে এ বছর পবিত্র ঈদুল ফিতর উৎসবের আনন্দ শেষ না হতেই বাঙালির আরেক প্রাণের উৎসব নববর্ষ বরণ।

তাইতো পহেলা বৈশাখে বগুড়া জেলা প্রশাসন ও বগুড়ায় অবস্থিত দেশের অন্যতম বেসরকারি সংস্থা টিএমএসএস বর্ণিল আয়োজনে নববর্ষ ১৪৩১ বঙ্গাব্দকে সাদরে বরণ অনুষ্ঠান করেন। শুধু তাই নয় আবহমান গ্রাম-বাংলার অধুনালপ্ত কৃষ্টি-কালচার ফিরিয়ে আনতে তথা বর্তমান প্রজম্মের প্রাণের সঞ্চার জাগাতে আয়োজন করেছে মাসব্যাপী বৈশাখী মেলা। তবে টিএমএসএস এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান ড. এনামুল হক আটর্স এন্ড কালচার একাডেমীর আয়োজনে বৈশাখী মেলার আগে ঈদের দিন থেকেই মাসব্যাপী মেলার আয়োজন করেছে।

মেলাটিতে প্রতিদিনই বিকাল ৫টা থেকে রাত ১০টা অবদি চলে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মীদের নানা অনুষ্ঠান। এতে ড. এনামুল হক আটর্স এন্ড কালচার একাডেমীর নিয়মিত শিল্পীরা সহ জেলার বিভিন্ন উপজেলা পর্যায়ের সাংস্কৃতিক কর্মীরা তাদের সংগীত পরিবেশন করে আসছেন।

অন্যদিকে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে ও বগুড়া থিয়েটারের এবং সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সহযোগীতায় সাত দিনব্যাপী ৪৩তম বৈশাখী মেলা শুরু হয়েছে। বগুড়া শহীদ টিটু মিলনায়তন ও বগুড়া অ্যাডওয়ার্ড পৌর পার্ক চত্ত্বরে বাদ্যের তালে তালে চলে লাঠিখেলা ও শাপ খেলা। এসব দেখে মুগ্ধ হচ্ছে মেলায় আগত দর্শকরা।

সাত দিনের বৈশাখী মেলার মঞ্চে বাউলসংগীত, লোকজ নৃত্য, লাঠিখেলা, শাপ খেলা, পালাগান ছাড়াও নানা লোকজ খেলা পরিবেশিত হচ্ছে। জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, বগুড়া পৌরসভা, বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটার ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সহযোগিতায় মেলায় লোকজ এই মেলায় ৪০টি স্টল বসেছে। স্টলগুলোতে স্থানীয় কারুশিল্পীদের উৎপাদিত পণ্য, কৃষিপণ্য, বাঁশ, বেত, পাট, শোলা, ধাতব, মৃৎ, চামড়া, তন্তুজাত হরেক রকমের কারুপণ্য, বাচ্চাদের খেলনা এবং ঐতিহ্যবাহী নানা খাবারের পসরা বসেছে। শিশুদের বিনোদনের জন্য আছে নাগরদোলা, চরকি, ট্রেন, সাম্পান নৌকায় শিশুদের বিনোদনের আয়োজনও আছে।

সরেজমিনে মঙ্গলবার(১৬ এপ্রিল) বিকালে বগুড়া সদর উপজেলার গোকুলে অবস্থিত টিএমএসএস এর প্রতিষ্ঠান পাঁচ তারকা হোটেল মমইন সংলগ্ন টিএমএসএস এর বিনোদন জগত চত্বরে অনুষ্ঠিত মাসব্যাপী ঈদ ও বৈশাখী মেলা। সেখানে অন্যরকম অনুভূতির অংশ চিত্ত বিনোদনের নানা সমাহার দেখে এবং উপভোগ করে বেশ মুগ্ধ হচ্ছে দর্শকরা এমনটাই দৃশ্য নজর কাঁড়ার মতো।

গত মঙ্গলার(১৬ এপ্রিল) তথা মেলার ৫ম দিন সন্ধ্যায় ড. এনামুল হক আটর্স এন্ড কালচার একাডেমীর আয়োজনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন একই একাডেমী নিজস্ব শিল্পী এবং শেরপুর উপজেলার সুনামধন্য সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান নৃত্যাঞ্জলী আর্টস একাডেমী। এসময় নৃত্যাঞ্জলী আর্টস একাডেমীর নৃত্যগুরু ও সভাপতি, বাংলাদেশ টেলিভিশনের নিয়মিত নৃত্য শিল্পী কামরুল হাসান পাশার পরিচালনায় একঝাঁক শিক্ষার্থী শিল্পী-কলা কুশলীরা তাদের মনমুগ্ধকর নৃত্যানুষ্ঠান উপহার দেয়।

মেলা প্রাঙ্গনে নববর্ষ পহেলা বৈশাখ বরণ ও মেলা পরিচালনার সভাপতি মোঃ সহিদুল ইসলাম খাঁনের উপস্থিতে অনুষ্ঠানস্থলে টিএমএসএস এর কর্ণধর নির্বাহী পরিচালক ড.অধ্যাপিকা হোসনে আরা বেগম, সহ একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী উপস্থিত হন এবং শিল্পীদের গান ও নৃত্য উপভোগ করেন। ড. এনামুল হক আটর্স এন্ড কালচার একাডেমীর অধ্যক্ষ মো. আব্দুল হান্নান পরিচালনায় অনুষ্ঠান শেষে নৃত্যাঞ্জলী আর্টস একাডেমীর শিল্পী ও পরিচালকদের সাথে সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হয়ে ফটোসেশনে অংশ গ্রহন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ড.অধ্যাপিকা হোসনে আরা বেগম।

এ সময় নৃত্যাঞ্জলী আর্টস একাডেমীর সাধারণ সম্পাদক মোজাফফর আলী ও শেরপুর উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি দীপক কুমার সরকার, টিএমএসএস এর নির্বাহী পরিচালকের ব্যক্তিগত সচিব মো. আব্দুল হান্নান উপস্থিত ছিলেন। এ মেলাতেও রয়েছে বিসিএলের প্যাভিলন, টিএমএসএসের অর্গানিক ফুড কর্ণার, ঘাণির খাঁিট সরিষার তেলের দোকান ও রাহুল গ্রুপের পণ্যের সমাহার সম্বলিত স্টল সহ একাধিক বিভিন্ন ট্রেড ও চটপটি-ফুচকার দোকান বসেছে। এছাড়াও টিএমএসএস পরিচালিত বিভিন্ন রাইডে চড়ে ও নৌকা ভ্রমণ করে দর্শণার্থীরা আনন্দ উপভোগ করেন। সবার জন্য সারা মাস ব্যাপী মেলায় আনন্দ উপভোগের সুযোগ রয়েছে। তবে মেলায় আলোকসজ্জা দর্শকদের বেশ দৃষ্টি কাঁড়ছে এমনটাই অভিমত ব্যক্ত করেছে।

এদিকে বগুড়ার শহরের প্রাণকেন্দ্রে পৌর অ্যাডওয়ার্ড পার্কে ঐতিহ্যাবাহী বৈশাখী মেলার মূলমঞ্চে একই দিনে সাপ খেলার আয়োজন করা হয়। এবারের মেলায় সাপ খেলা দেখান জয়পুরহাট জেলার আক্কেলপুরের গোপীনাথপুর এলাকার সাগর হোসেন নামের এক সাপুড়ে। মঞ্চে তিনি ৬টি বড় আকৃতির বিষধর সাপের খেলা দেখান।

সাপুড়ে সাগর হোসেন বলেন, এই মেলায় এবারই প্রথম এসেছি। এর আগে আমার বাবা আসতো। বাবা মারা যাওয়ার কারণে এখন আমি সাপ খেলা দেখাই। তিন পুরুষ ধরে এই সাপ খেলা দেখানোর সাথে আমরা জড়িত।
তিনি আরও বলেন, ‘আমি ১৮ বছর ধরে এই সাপ খেলা দেখাচ্ছি, আজ ছয়টা সাপ এনেছিলাম। চেষ্টা করেছি সবাইকে আনন্দ দেয়ার। আর আমার বাড়িতেও সাপ আছে। সাপের ডিম থেকে বাচ্চা ফুটাই। আর এটা দিয়েই আমাদের ৮জনের সংসার চলে।’

বৈশাখী মেলার আয়োজক ও বগুড়া সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি তৌফিক হাসান ময়না বলেন, গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য তুলে ধরাই আমাদের মেলার মূল উদ্দেশ্য। লাঠি খেলা, পাতা খেলার পর আজ সাপ খেলা দেখানো হলো। এসব ঐতিহ্যবাহী খেলা রাখার একটাই কারণ যাতে নতুন প্রজন্ম এসব গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য ভুলে না যায়।

টিএমএসএস’র লিয়াজো পরামর্শক ও বৈশাখী মেলার সভাপতি মোঃ সহিদুল ইসলাম খান বলেন, বাংলা নববর্ষ গ্রাম-বাংলার আবহমান সংস্কৃতির অংশ। তবে নববর্ষ বরণ করতে পেরে টিএমএসএস পরিবার ও আমি ব্যক্তিগত ভাবে আনন্দিত। টিএমএসএসের প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী পরিচালক ড. হোসনে আরা বেগম এর গতিশীল নেতৃত্বে আগামী বছর আরো বেশি জাঁকজমকপূর্ণ ভাবে এ অনুষ্ঠান পালন চেষ্টা করা হবে আশাবাদ ব্যক্ত করেন ওই কর্মকর্তা।

Leave A Reply

Your email address will not be published.