বগুড়ায় যমুনায় ভাঙন, নিরাপদ আশ্রয়ে যাচ্ছে মানুষ

0 ৭৮

দীপক কুমার সরকার, বগুড়া: গত কয়েক দিনের বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢলের পানিতে বগুড়ার যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীশা ছুঁই ছুঁই। এতে করে জেলার সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনট উপজেলায় বয়ে যাওয়া যমুনা নদীর বগুড়া অংশে পানি বৃদ্ধি পেয়ে নিম্নাঅঞ্চল তলিয়ে গেছে। সেই সঙ্গে নদীতে ভাঙন দেখা দেয়ায় নদী পাড়ের মানুষজন অন্যত্র মালামালা নিয়ে চলে যাচ্ছেন।

গত দুই দিনে প্রায় তিন শতাধিক গাছ ও বেশ কিছু ঘরবাড়ি নদী বক্ষে তলিয়ে গেছে। এছাড়াও যমুনা তীরের ধুনট উপজেলার সরকারি দু’টি প্রাথমিক বিদ্যালয় চতুর্থবারের মতো পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এদিকে ভাঙন দেখা দেয়ায় বগুড়া পাউবি’র পক্ষ থেকে সেখানে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা অব্যাহত রেখেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

বগুড়া পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, গত কয়েকদিন যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে আর মঙ্গলবার (২৯ আগস্ট) নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ৯ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়। বুধবার (৩০ আগস্ট) বিকেল ৩টায় বিপদসীমার ৩ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। পানির উচ্চতা ছিল ১৬.২৮ মিটার। বগুড়া সারিয়াকান্দিতে যমুনা নদীর পানি প্রবাহিত হচ্ছে ১৬.২৮ সেন্টিমারে। আর বিপদসীমা হলো ১৬.২৫ মিটার।

যমুনা নদীর পাশাপশি গত ২৪ ঘণ্টায় বাঙালি নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে ৪২ সে.মি। বুধবার দুপুরে বাঙালি নদীর পানি ১৪.৩৬ মিটার নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছিল। নদীর বিপৎসীমা নির্ধারণ করা আছে ১৫.৪০ সেন্টিমিটার বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী হুমায়ুন কবীর।

ধুনটের কয়েক দিন ধরে পানি বৃদ্ধির ফলে ফুসে উঠেছে যমুনা। সহড়াবাড়ি ঘাট এলাকায় গত ২৪ ঘন্টায় ১২ সেন্টিমিটার পানি বেড়ে ১৬.২৮ সেন্টিমিটার সমতায় পানি প্রবাহিত হচ্ছে। অর্থাৎ বুধবার দুপুর নাগাদ যমুনা নদীর পানি বিপৎসীমার ৩ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারি প্রকৌশলী নিবারণ চক্রবর্তী জানিয়েছেন।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিক নদীর পানি বৃদ্ধির গতি বিধি পরিদর্শন করছে। তবে সারিয়াকান্দি উপজেলার কামালপুর ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে নতুন করে যমুনা নদী ভাঙতে শুরু করেছে।

কামালপুর ইউনিয়নের ইছামারা এবং কামালপুর গ্রামে ভাঙন তীব্রতা ধারণ করেছে। পানি বৃদ্ধিতে উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নের নীজ কর্ণিবাড়ী, বয়রাকান্দি, ধলিরকান্দি, বড় কুতুবপুর এবং পার দেবডাঙ্গা। চালুয়াবাড়ী ইউনিয়নের সুজালীর পাড়া, চর দলিকা, হাটবাড়ী, সুজনের পাড়া, শিমুলতাইড় এবং মানিকদাইড় চরের বেশ কিছু পরিবারের বাড়িঘরে পানি উঠেছে এবং হাজারো পরিবার পানিবন্দী হয়েছে। কাজলা ইউনিয়নের কুড়িপাড়া, কাজলা, বাওইটোনা, উত্তর টেংরাকুড়া, দক্ষিণ টেংরাকুড়া, এবং জামথল চর। শেরপুর ইউনিয়নের দিঘাপাড়া চরের প্রায় ১৮০ পরিবার পানিবন্দি। বোহাইল ইউনিয়নের উত্তর শংকরপুর, দক্ষিণ শংকরপুর এবং ধারাবর্ষা চরসহ বেশকিছু চরের অনেক বাড়িঘরে পানি ওঠার খবর পাওয়া গেছে।

এছাড়াও কর্ণিবাড়ী ইউনিয়নের ইন্দুরমারা, ডাকাতমারা, নান্দিনার চর, শোনপচা চরে পানি ওঠায় অনেক পরিবার পানিবন্দী হয়েছে। এসব এলাকার বাসিন্দারা তাদের ঘরের প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র এবং তাদের গৃহপালিত গবাদিপশু নিয়ে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধ, আশ্রয়কেন্দ্র অথবা উঁচু কোথাও আশ্রয়ের দিকে যাচ্ছেন।

কামালপুর গ্রামে জন্ম নেয়া শাহজাহান বলেন, এ গ্রামে আমাদের বেশ জমাজমি ছিল। কিন্তু ২৫ বছর আগে আমি যমুনা নদী ভাঙনের শিকার হয়ে এ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধে আশ্রয় নিয়েছি। এখন যমুনায় ভিটেমাটি হারিয়ে আমরা নিরুপায় হয়ে বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধেই আশ্রয়।

শাহজাহানের মতো একই গ্রামের জহুরুল হোসেন, মানিক, মুকুল মিয়া, মোজাম, মোসলেম, পল্টু, শাহনাজ বেগম, চাঁন মিয়া আকন্দসহ অর্ধশতাধিকরা বাসিন্দারা বাড়ী ভেঙ্গে ঘরের টিন, আসবাবপত্র তুলে নিয়ে নিরাপদ স্থানের ছুটে যাচ্ছে।

এদিকে ধুনট উপজেলায় যমুনা নদীর তীরবর্তীতে বাঁধের অভ্যন্তরে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করছে। কৈয়াগাড়ি ও শিমুলবাড়ি সরকারি দু’টি প্রাথমিক বিদ্যালয় চতুর্থবারের মতো পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় ফের বিদ্যালয়ে যেতে না পেরে লেখাপড়া নিয়ে বিপাকে পড়েছে দুই শতাধিক শিক্ষার্থী।

উপজেলার কৈয়াগাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাসুদ রানা বলেন, গত দুই মাসে চতুর্থবারের মতো বিদ্যালয়টি পানিবন্দি হয়ে পড়ে। প্রতিবছরই বন্যায় শুধু শিক্ষার্থীদের লেখাপড়ার পাশাপাশি আসবাসপত্রসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ক্ষতি হয়। বিদ্যালয় পানিবন্দি থাকায় পাঠদানে সমস্য হচ্ছে। তাই শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার খুবই কম।

তবে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ফজলুর রহমান বলেন, কৈয়াগাড়ি ও শিমুলবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় দুটো পানিতে নিমজ্জিত হওয়ায় শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পাঠদান ব্যহত হচ্ছে। তবে বিকল্প হিসেবে বিদ্যালয়ের আশেপাশের উচু বাঁধ কিংবা বাড়িতে পাঠদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

বগুড়া জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল হক বলেন, তিন উপজেলার মধ্যে সারিয়াকান্দির কামালপুর ইউনিয়নে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বেড়িবাঁধের পাশে যেখানে নদীতে ভাঙন দেখা দিয়েছে, সেই বেড়িবাঁধটি পূর্বে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। এর এক কিলোমিটার দূরে আরও একটি নতুন বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। তবে আতঙ্কের কিছু নাই, এটা সাময়িক বন্যা। ভাঙন কবলিত এলাকায় বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে।

Leave A Reply

Your email address will not be published.