রাজাদের বসবাস ও জমিদারির নাম থেকে ‘রাজশাহী’

0 546

ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল আয়তনের বাংলাদেশের নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সমৃদ্ধ ইতিহাস, ঐতিহ্য, বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতি, দৃষ্টিনন্দন জীবনাচার মন কাড়ে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের। পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, ঐতিহাসিক মসজিদ ও মিনার, নদী, পাহাড়, অরণ্যসহ হাজারও সুন্দরের রেশ ছড়িয়ে আছে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত।

 

দেশের আট বিভাগে (ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, খুলনা, রাজশাহী, রংপুর, সিলেট ও ময়মনসিংহ) ৬৪ জেলা। প্রতিটি জেলার নামকরণের সঙ্গে রয়েছে ঐতিহ্যপূর্ণ ইতিহাস। এসব ঘটনা ভ্রমণপিপাসু উৎসুক মনকে আকর্ষণ করে। তাই বাংলা ট্রিবিউন জার্নিতে ধারাবাহিকভাবে জানানো হচ্ছে বাংলাদেশের ৬৪ জেলার নামকরণের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।

পুঠিয়া রাজবাড়ি 

রাজশাহী জেলা
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত রাজশাহী ইতিহাসখ্যাত নগরী। প্রাচীন পুন্ড্রবর্ধন জনপদের অংশ রাজশাহীর জনবসতি হাজার বছরের ঐতিহ্য বহন করছে। এ শহরের নিচ দিয়ে বয়ে গেছে একদা প্রমত্তা পদ্মার প্রাণলীলা।

রাজশাহীর রেশম সুতা ও রেশমবস্ত্র বিখ্যাত। অন্যান্য কুটিরশিল্পের মধ্যে তাঁত, বাঁশ ও বেত, স্বর্ণকার, কামার, কুমার, কাঠের কাজ, কাঁসা, সেলাই উল্লেখযোগ্য। এখানে দেশের প্রায় সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। দেশের একমাত্র পুলিশ একাডেমি ও পোস্টাল একাডেমি এই জেলায় অবস্থিত।

 

রাজশাহী জেলার নামকরণ নিয়ে প্রচুর মতপার্থক্য রয়েছে। এর মধ্যে বেশি প্রচলিত, এই অঞ্চলে বহু রাজা-জমিদারের আবাসস্থলকে কেন্দ্র করে নাম হয়েছে ‘রাজশাহী’। পঞ্চদশ শতকে ভাতুরিয়া দিনাজপুরের জমিদার রাজা গনেশ এখানকার অধিপতি ছিলেন। তিনি রাজা শাহ নামে পরিচিতি ছিলেন। মনে করা হয় ‘রাজা’ আর ‘শাহ’ মিলে ‘রাজশাহী’ নামকরণ হয়েছে।

 

ইতিহাসবিদ অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়র মতে, ‘রাজশাহী’ রানি ভবানীর দেওয়া নাম। অবশ্য মিস্টার গ্রান্ট লিখেছেন, রানি ভবানীর জমিদারিকেই ‘রাজশাহী’ বলা হতো। ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টারের মতে, নাটোরের রাজা রামজীবনের জমিদারি ‘রাজশাহী’ নামে পরিচিত ছিল। ওই নামই এই জেলার জন্য গ্রহণ করে ইংরেজরা।

 

এই নামকরণ নিয়ে আরও অনেক কল্পকাহিনী রয়েছে। সাধারণভাবে বলা হয়, এই জেলায় বহু রাজা-জমিদারের বসবাস ছিল, সেজন্য এর নাম হয়েছে রাজশাহী। কেউ বলেন, রাজা গণেশের সময় (১৪১৪-১৪১৮) রাজশাহী নামের উদ্ভব। অনুমান করা হয়, ‘রামপুর’ ও ‘বোয়ালিয়া’ নামক দুটি গ্রামের সমন্বয়ে রাজশাহী শহর গড়ে উঠেছিল। প্রাথমিক পর্যায়ে ‘রামপুর-বোয়ালিয়া’ নামে অভিহিত হলেও পরবর্তী সময়ে ‘রাজশাহী’ নামটিই সর্বসাধারণের কাছে বেশি পরিচিতি লাভ করে।

রাজশাহী জাদুঘর (ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্স)রাজশাহী জাদুঘর

রামপুর-বোয়ালিয়া শহরের নামকরণ ‘রাজশাহী’ কীভাবে হলো তা নিয়ে বহু মতামত রয়েছে। রাজশাহী শব্দটি বিশ্লেষণ করলে দুটি ভিন্ন ভাষার একই অর্থবোধক দুটি শব্দের সংযোজন পরিলক্ষিত হয়। সংস্কৃত ‘রাজ’ ও ফারসি ‘শাহ’-এর বিশেষণ ‘শাহী’ শব্দযোগে ‘রাজশাহী’ শব্দের উদ্ভব। এর অর্থ একই— রাজা বা রাজা-রাজকীয় অথবা বাদশাহ বা বাদশাহী।

 

বাংলা ভাষায় আমরা একই অর্থের অনেক শব্দ দু’বার উচ্চারণ করে থাকি। যেমন– শাক-সবজি, চালাক-চতুর, ভুল-ভ্রান্তি, ভুল-ত্রুটি, চাষ-আবাদ, জমি-জিরাত, ধার-দেনা, শিক্ষা-দীক্ষা, দীন-দুঃখী, ঘষা-মাজা, মান-সম্মান, দান-খয়রাত, পাহাড়-পর্বত, পাকা-পোক্ত, বিপদ-আপদ ইত্যাদি। একইভাবে ‘রাজশাহী’ শব্দের উদ্ভবও এভাবে ঘটার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

 

রাজশাহীর দর্শনীয় স্থানের তালিকায় রয়েছে পুঠিয়া শিবমন্দির, হাওয়াখানা, বড়কুঠি, পুঠিয়া রাজবাড়ী, বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর, শহীদ কামারুজ্জামান কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানা, পদ্মার পাড়, শাহ্ মখদুমের মাজার, রাজশাহী সাধারণ গ্রন্থাগার, রাজশাহী কলেজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, বাঘা মসজিদ, পদ্মাবিধৌত ঐতিহ্যবাহী রাজশাহী বোয়ালিয়া ক্লাব। শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি বিকাশে রাজশাহীর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। ভাওয়াইয়া ও গম্ভীরা এই অঞ্চলের সংস্কৃতির বিশেষ দিক।

Leave A Reply

Your email address will not be published.

x